“আমি চক্রান্তের শিকার, আসল অপরাধী ডিএম-এডিএম!” বীরভূমের গ্রেফতার প্রাক্তন ভূমি আধিকারিকের বিস্ফোরক দাবিতে তোলপাড়

বীরভূমের কয়েক হাজার কোটি টাকার বেআইনি পাথর পাচার মামলায় এবার পুলিশের জালে ধরা পড়লেন প্রাক্তন সহকারী ভূমি ও ভূমি সংস্কার (ডেপুটি ডিএলআরও) আধিকারিক রবিউল ইসলাম। পাথর মাফিয়া মহম্মদ নিজামুদ্দিন ওরফে টুলু মণ্ডলকে বেআইনি কারবারে প্রত্যক্ষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়া এবং কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে মহম্মদবাজার থানার পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে।

সোমবার ধৃত রবিউল ইসলামকে সিউড়ি জেলা আদালতে পেশ করা হলে বিচারক তাঁকে ৮ দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

“আমি চক্রান্তের শিকার, ডিএম-এডিএমদের তদন্তে আনা হোক”: আদালতে পেশ করার সময় এবং বেরোনোর মুখে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিস্ফোরক দাবি করেন প্রাক্তন ভূমি আধিকারিক রবিউল ইসলাম। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, “আমি সম্পূর্ণ চক্রান্তের শিকার। যে সময়ে এই ঘটনা ঘটেছে, সেই সময় জেলায় দায়িত্বে থাকা ডিএম (জেলাশাসক) এবং এডিএম-রা (ভূমি ও ভূমি সংস্কার) সবাই এতে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের সবাইকে তদন্তের আওতায় নিয়ে আসা হোক, তা হলেই আসল সত্য প্রকাশ্যে আসবে।”

মামলার সরকারি আইনজীবী অসীমকুমার দাস জানান, পুলিশ ১৪ দিনের হেফাজত চেয়েছিল, তবে আদালত ৮ দিনের নির্দেশ দিয়েছে। ধৃত আধিকারিক আদালতে জেলা প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের ভূমিকার ওপর তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন।

নকল ডিএসআর ও কয়েক হাজার কোটির রাজস্ব ফাঁকি: রাজ্যে পালাবদলের পর বীরভূমে একের পর এক বেআইনি পাথর পাচার কারবার প্রকাশ্যে আসে। অভিযোগ, মাফিয়া টুলু মণ্ডল তৎকালীন জেলা প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের সহযোগিতায় নকল ডিসিআর (DCR) ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, যার ফলে রাজ্যের বিশাল রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।

এই মামলায় এর আগে মহম্মদবাজারের বিএলএলঅ্যান্ডআরও সব্যসাচী মণ্ডল-সহ পাঁচজন সরকারি কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতেই উঠে আসে প্রাক্তন ডেপুটি ডিএলআরও রবিউল ইসলামের নাম। অভিযোগ উঠেছে, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে জেলা প্রশাসনের একাংশের মদতেই মাফিয়া টুলু মণ্ডলের এই অসীম প্রতিপত্তি তৈরি হয়েছিল।

দুবাইয়ে বসে মাফিয়া রাজ, সুপ্রিম কোর্টে সলিসিটর জেনারেল: এদিকে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারি ঘটিয়ে মূল অভিযুক্ত টুলু মণ্ডল সপরিবারে দুবাইয়ে চম্পট দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে ১০ বছরের জন্য ‘গোল্ডেন কার্ড’ নিয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে সে। কেন্দ্র সরকারের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছেন, দেশ ছাড়ার ঠিক আগে বীরভূমে নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে এক লপ্তে ৫২ কোটি টাকা দুবাইয়ের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করেছিল টুলু!

চার্জশিট, সাড়ে ২৮ কোটির ক্যাশ ও থাই-পাক মুদ্রা উদ্ধার: গত ১৩ অক্টোবর সিউড়ি জেলা আদালতে মহম্মদবাজার থানার পুলিশ এই সংক্রান্ত প্রথম চার্জশিট জমা দেয়, যেখানে ১২ জনের নাম উল্লেখ রয়েছে (যার মধ্যে ১১ জন ইতিমধ্যেই গ্রেফতার, ৪ জন সরকারি কর্মী)।

তদন্তে নেমে পুলিশ ও স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF) যা উদ্ধার করেছে তা চোখ কপালে তোলার মতো:

  • টুলুর আত্মীয়ের বাড়ি থেকে সাড়ে ২৮ কোটি টাকা নগদ এবং ১৫ কেজি বিদেশি সোনার বাট বাজেয়াপ্ত।

  • অনুব্রত মণ্ডলের প্রাক্তন দেহরক্ষী সায়গল হোসেনের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে মিলল পাকিস্তানের মুদ্রা।

  • অন্য এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে মিলল থাইল্যান্ডের মুদ্রা।

  • টুলুর ২৪২টি ট্রাক-ডাম্পার, ৭টি বাড়ি, ৩টি পাথর খাদান ও ৩০০ বিঘা জমি-সহ মোট ২২০ কোটি টাকার সম্পত্তি সিজ করেছে পুলিশ।

বর্তমানে পাথর মাফিয়া টুলু মণ্ডলকে ভারতে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড কর্নার’ নোটিশ জারি করা হয়েছে। তবে প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের যোগসাজশের নতুন দাবিতে পুরো ঘটনার মোড় অন্যদিকে ঘুরতে শুরু করেছে।