‘আমার আর বেঁচে থাকার ইচ্ছা নেই’! আইফোনের আবদার মেটাতে গিয়ে পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে সপরিবারে আত্মহত্যা

ছত্রপতি সম্ভাজিগনগর, ২৩ আগস্ট: নতুন আইফোনের ইএমআই (EMI) মেটানোকে কেন্দ্র করে পারিবারিক অশান্তি এবং তার জেরে এক মর্মান্তিক পাহাড়ে ট্র্যাজেডির ঘটনায় কেঁপে উঠল দেশ। মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের কোহদ্যা ডোঙর পাহাড়ে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৮ বছরের এক তরুণ, তাঁর মা এবং বাবা। এই ঘটনার পর সামনে এসেছে বেশ কিছু পুরোনো ও সাম্প্রতিক ভিডিও, যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পাশাপাশি নাড়িয়ে দিয়েছে সাধারণ মানুষকে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত শুক্রবার সকাল ১০টা নাগাদ এই ঘটনার সূত্রপাত। মৃত তরুণ কুণাল চন্দগুঁড়ে একটি নতুন আইফোন কিনেছিলেন। সেই ফোনের কিস্তি বা ইএমআই দেওয়ার জন্য তিনি পরিবারের কাছে বারবার টাকা দাবি করছিলেন। এই নিয়ে বাবা মুরলীধর চন্দগুঁড়ে (৪৮) এবং মা সঙ্গীতার সঙ্গে তাঁর তীব্র বচসা হয়। ক্ষোভে ও অভিমানে ১৮ বছরের কুণাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজাসুজি চলে যান কোহদ্যা ডোঙর পাহাড়ের চূড়ায়।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শুধুমাত্র একটি আইফোন এই চরম মানসিক অবস্থার কারণ ছিল না। বিগত প্রায় ছয় বছর আগে এই পরিবারের বড় ছেলের আকস্মিক ও অসুস্থতাজনিত মৃত্যুর পর থেকেই পারিবারিক স্তরে একটি অদৃশ্য মানসিক চাপ ও শোকের আবহ তৈরি হয়েছিল। সেই পুরোনো পারিবারিক টানাপোড়েন এবং আইফোনকেন্দ্রিক ক্ষোভের জেরে পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নেয় শুক্রবার দুপুরে।

ছেলের চরম পদক্ষেপের কথা বুঝতে পেরে উদ্বিগ্ন বাবা-মা মুরলীধর ও সঙ্গীতা স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাকে সঙ্গে নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় ছুটে যান। তাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে কুণালকে বোঝানোর চেষ্টা করেন এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরে আসার অনুরোধ জানান। কিন্তু জেদি ও অবসাদগ্রস্ত তরুণ কিছুতেই কথা শুনতে রাজি হননি। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে বোঝানোর পর বাবা মুরলীধর ছেলের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছন এবং তাঁকে পাহাড়ের কিনারা থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে বিপত্তি। ভারসাম্য হারিয়ে বাবা ও ছেলে দুজনেই প্রায় ২৫০ ফুট গভীর খাদে নিচে পড়ে যান। চোখের সামনে স্বামী ও সন্তানকে খাদে তলিয়ে যেতে দেখে মুহূর্তের মধ্যে চরম সিদ্ধান্ত নেন মা সঙ্গীতাও। তিনি বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে পাহাড়ের চূড়া থেকে সরাসরি নিচে ঝাঁপ দেন।

এই মর্মান্তিক ঘটনার আগে পাহাড়ের ওপরের বেশ কয়েকটি হৃদয়বিদারক দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হয়েছে। একটি ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, মা সঙ্গীতা মাটিতে বসে হাতজোড় করে ছেলেকে বারবার অনুরোধ করছেন বিপদজনক স্থান থেকে সরে আসার জন্য। তিনি ছেলের সামনে মাটিতে শুয়ে পড়ে এবং তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে আকুতি জানান। অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কুণাল তাঁর মাকে লক্ষ্য করে স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, “মা, কেউ আমার কথা শোনে না। আমার আর বেঁচে থাকার ইচ্ছা নেই। আমার জীবনে কিছু হবে না। আর ভাল কিছু হওয়ার নেই।” অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া আরও দুটি পুরোনো ভিডিওতে দেখা গেছে, যেখানে কুণাল হাসিমুখে মায়ের সঙ্গে চা খাচ্ছেন কিংবা মায়ের পা ধুইয়ে আশীর্বাদ নিচ্ছেন। সেই ছবিগুলোর সঙ্গে বর্তমানের এই বিভীষিকাময় পরিণতির কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন না কেউ।

স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত নেপথ্যে কী কারণ ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এই ধরনের ঘটনা বর্তমান প্রজন্মের মানসিক অবসাদ এবং পারিবারিক যোগাযোগের অভাবকে ফের একবার তীব্রভাবে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হতেই সাধারণ মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।