আপনার ফোনে দেখায় এক, আর সরকার বলছে অন্য! দিল্লিতে বাতাসের বিষ নিয়ে কোন ডেটা সত্যি?

দেশের রাজধানী দিল্লি ও সংলগ্ন জাতীয় রাজধানী অঞ্চল (NCR)-এর বাতাস প্রতিনিয়ত আরও বেশি বিষাক্ত ও মারাত্মক হয়ে উঠছে। দূষণের এই ভয়াবহ রূপ ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের দরজাতেও কড়া নেড়েছে। শুক্রবার সর্বোচ্চ আদালতে এই সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে বিচারপতিরা মন্তব্য করেন যে, প্রশাসনিক বিধিনিষেধ চাপানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আচরণগত পরিবর্তন ও সচেতনতাই দূষণ প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি। তবে দিল্লির ক্রমবর্ধমান এই দূষণ পরিস্থিতির মাঝে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বাতাসের মান বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI)-এর পরিসংখ্যান নিয়ে।
কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (CPCB)-এর সরকারি তথ্য এবং সাধারণ মানুষের স্মার্টফোনে থাকা বিভিন্ন বেসরকারি ওয়েদার অ্যাপের দেওয়া AQI রিডিংয়ের মধ্যে মিলছে না কোনো হিসেব! একই দিনে এবং একই সময়ে সরকারি ডেটার সঙ্গে মোবাইল অ্যাপের তথ্যে কেন এত বিশাল তফাত ফুটে উঠছে, তা নিয়ে আমজনতার মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
একই দিল্লির বাতাসে কেন দু’রকম পরিসংখ্যান?
শুক্রবার সকালে CPCB-এর বুলেটিন অনুযায়ী দিল্লির গড় AQI রেকর্ড করা হয় ৩৮৯, যা ‘অত্যন্ত খারাপ’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। রোহিণীতে তা সর্বোচ্চ ৪৭৩, আর কে পুরমে ৪৪১ এবং অলিপুরে ৪৩৫ ছুঁয়ে ফেলে। অন্যদিকে, বেসরকারি বিভিন্ন ফোনের অ্যাপে ঠিক সেই সময়েই ভিন্ন ও আরও উদ্বেগজনক সংখ্যা ফুটে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাপ এবং সরকারি ব্যবস্থার মধ্যে এই পার্থক্যের পেছনে রয়েছে প্রধানত ৪টি মূল প্রযুক্তিগত কারণ:
ভিন্ন গণনা স্কেল (Different Scales): এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স কিন্তু সরাসরি মাপা কোনো একক নয়, এটি একটি বিশেষ গাণিতিক হিসেব। প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে বাতাস পরিমাপ করে। ভারতের CPCB এবং আমেরিকার EPA (Environmental Protection Agency) সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন স্কেল বা ‘ব্রেকপয়েন্ট’ ব্যবহার করে। ফলে বাতাসে ক্ষতিকারক কণার (PM10 বা PM2.5) পরিমাণ একই থাকা সত্ত্বেও আমেরিকান অ্যাপ এবং ভারতের সরকারি স্কেলে AQI-এর চূড়ান্ত সংখ্যা আলাদা দেখায়।
তথ্য সংগ্রহের সময় ও ব্যবধান: CPCB মূলত গত ২৪ ঘণ্টার একটি গড় বায়ুর মান হিসেব করে আপডেট দেয়। অন্যদিকে স্মার্টফোনের থার্ড-পার্টি অ্যাপগুলি প্রায় প্রতি ঘণ্টায় বা তাৎক্ষণিক তথ্য দেখায়। ফলে তৎক্ষণাৎ আবহাওয়া ও ধোঁয়াশার সামান্য পরিবর্তনে অ্যাপের মান দ্রুত বদলে গেলেও সরকারি ২৪ ঘণ্টার গড়ে তা ততটা চটজলদি প্রতিফলিত হয় না।
মনিটরিং সেন্টারের অবস্থান ও দূরত্ব: সরকারি মনিটরিং স্টেশনগুলি নির্দিষ্ট কয়েকটি কেন্দ্রস্থলে বসানো থাকে। কিন্তু অ্যাপগুলি প্রায়শই নিকটবর্তী অন্যান্য ব্যক্তিগত সেন্সর বা উপগ্রহ চিত্রের অনুমানভিত্তিক পরিসংখ্যান ব্যবহার করে, যার ফলে পরিমাপের এই ভৌগোলিক তারতম্য দেখা দেয়।
দূষণকারী উপাদানের প্রার্থক্য: CPCB মূল ৮টি দূষণকারী উপাদানের তথ্য বিশ্লেষণ করে সার্বিক AQI প্রকাশ করে। তবে অনেক মোবাইল অ্যাপ কেবল PM2.5 কণার ওপর ভিত্তি করেই দ্রুত ফলাফল দেখায়, যার ফলে চূড়ান্ত সূচকে পার্থক্য ঘটে।
তাহলে সাধারণ মানুষ কোনটা বিশ্বাস করবেন? পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় পরিবেশ ও তৎক্ষণাৎ সতর্কতা পেতে মোবাইল অ্যাপের তাৎক্ষণিক আপডেট সহায়ক হলেও, ভারতের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত পরিমাপের সবচেয়ে সঠিক ও অথেন্টিক হিসাব দেয় কেন্দ্রের ‘CPCB’-এর সরকারি ডেটাই।