অণ্ডকোষের সমস্যা থেকে ফিস্টুলা—যে রোগগুলো নিয়ে কথা বলতে আজও তীব্র লজ্জা পান পুরুষেরা!

নারীদের ক্ষেত্রে লজ্জা ও সংকোচের কারণে নানা শারীরিক অসুস্থতা বা রোগের কথা পরিবারের কাছে লুকিয়ে রাখার প্রবণতা বহু পুরোনো। জটিল আকার ধারণ না করা পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই তারা মুখ খুলতে চান না। তবে সাম্প্রতিক চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা বলছে, এই সংকটের বৃত্তে কেবল নারীরাই নন, বিশ্বজুড়ে অজস্র পুরুষও তাঁদের বিভিন্ন সংবেদনশীল রোগ বা শারীরিক সমস্যা সম্পর্কে তীব্র লজ্জা ও সংকোচ বোধ করেন এবং তা গোপন করে রাখেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, পুরুষরা সাধারণত যে সমস্ত শারীরিক সমস্যা বা রোগ নিয়ে কথা বলতে সবচেয়ে বেশি কুন্ঠাবোধ করেন, তার সিংহভাগই তাঁদের প্রজননতন্ত্র বা সংবেদনশীল অঙ্গের নানা জটিলতা। এর মধ্যে অণ্ডকোষের নানাবিধ সমস্যা, যৌন দুর্বলতা (ইরেক্টাইল ডিসফাঙ্কশন বা প্রিম্যাচিওর ইজাকুলেশন), ফিস্টুলা, হার্নিয়া কিংবা গাইনোকোমেশিয়া বা পুরুষের অস্বাভাবিক স্তন বৃদ্ধির মতো সমস্যাগুলি অন্যতম।

স্ত্রীর কাছেও যখন সবকিছু চেপে যাওয়ার প্রবণতা: ঢাকার বাসিন্দা সাবিনা ইয়াসমিন (ছদ্মনাম) সম্প্রতি তাঁর স্বামীর একটি ঘটনা শেয়ার করে জানান, কী ভয়ানক পরিণতি হতে পারে এই গোপনীয়তার। মাসকয়েক আগে তিনি লক্ষ্য করেন যে তাঁর স্বামী ঠিকভাবে বসতে পারছেন না এবং তাঁর চলাফেরায় স্পষ্ট ব্যথার ছাপ রয়েছে।

প্রথমদিকে স্বামীর কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান যে পায়ুপথের কাছে একটি সাধারণ ফোঁড়া হয়েছে। কিন্তু স্ত্রীর চোখের আড়ালেই দিনের পর দিন কষ্ট সহ্য করতে থাকেন ওই ব্যক্তি। শেষ পর্যন্ত জোর করে তাঁকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান সাবিনা। জানা যায়, ওই ৫০ বছর বয়সি ব্যক্তির পায়ুপথে মারাত্মক ফিস্টুলা তৈরি হয়েছে। পায়ুপথের কাছে নিতম্বের অংশে একটি সুড়ঙ্গের মতো তৈরি হয়ে সেখানে প্রচুর পরিমাণে পুঁজ জমে গিয়েছিল।

এই জটিল সমস্যার চিকিৎসায় শেষ পর্যন্ত দশ দিন পরপর মোট তিনটি কঠিন অস্ত্রোপচার করতে হয়, যার পেছনে খরচ হয় প্রায় ছয় লাখ টাকা। সাবিনার আক্ষেপ, সময়মতো জানালে দ্রুত ইন্টারনেটে তথ্য ঘেঁটে বা চিকিৎসকের কাছে গিয়ে এই চরম পরিস্থিতি এড়ানো যেত।

পুরুষদের কোন রোগগুলি নিয়ে সবচেয়ে বেশি লুকোচুরি? ইউরোলজিস্ট ডা. ফজল নাসেরের মতে, পুরুষদের গোপনীয়তার তালিকায় থাকা প্রধান কয়েকটি সমস্যা হলো:

  • অণ্ডকোষের বিভিন্ন সমস্যা: হাইড্রোসিল, যেখানে অণ্ডকোষের বাইরে জল জমে ফুলে যায়। এছাড়া আঘাত বা প্রদাহের কারণেও এমন হতে পারে।

  • হার্নিয়া: হাঁচি, কাশি বা জোরে হাঁটলে পেটের ভেতর থেকে নাড়িভুঁড়ি বা অঙ্গের অংশ অণ্ডকোষের দিকে নেমে আসার অনুভূতি হয়।

  • টেস্টিকুলার টরশন ও ভেরিকোসিল: অণ্ডকোষকে যুক্ত করা তারের মতো অংশ পেঁচিয়ে যাওয়া কিংবা পেটের রক্তনালী ফুলে কৃমির মতো হয়ে যাওয়া (ভেরিকোসিল)।

  • টেস্টিকুলার সিস্ট: দুটি অণ্ডকোষের পাশে নতুন অন্য কোনো অংশের মতো মনে হওয়া।

চিকিৎসকদের স্পষ্ট সতর্কবার্তা, অণ্ডকোষের বেশিরভাগ সমস্যায় অঙ্গটি ফুলে যাওয়া এবং ব্যথা হওয়া প্রধান লক্ষণ। বিশেষ করে যদি অণ্ডকোষের স্বাভাবিক অনুভূতি বা সংবেদনশীলতা চলে যায় এবং তা ধীরে ধীরে ফুলতে থাকে, তবে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই এগুলি প্রাণঘাতী ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। পুরুষদের এই মানসিক সংকোচ ও লুকোচুরি ভাঙাতে তাই স্ত্রী বা জীবনসঙ্গীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।