টাকায় বিক্রি হচ্ছে চিকিৎসকের ডিউটি! বাংলার সরকারি হাসপাতালেও রোগীদের জীবন নিয়ে এই কোন ভয়ঙ্কর খেলা?

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ জুড়ে ডাক্তারদের দায়িত্ব পালনে এক বিপজ্জনক ও চাঞ্চল্যকর অসঙ্গতি সামনে এসেছে, যা সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। কিছু এমবিবিএস ইন্টার্ন নিজেদের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব ঠিকমতো পালন না করে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অন্যদের সেই ডিউটি বিক্রি করে দিচ্ছেন। এই চক্রের অধীনে এক ঘণ্টা ডিউটির জন্য ২০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি কেবল নিজেদের মধ্যে শিফট বদলের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং অভিযোগ উঠেছে যে হাসপাতালে নিজেদের বদলে ডেন্টাল কলেজের ছাত্রছাত্রী এবং চিকিৎসা পেশার বাইরের লোকজনকে পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের জন্য বসানো হচ্ছে। এর ফলে চিকিৎসার আশায় হাসপাতালে আসা অসহায় রোগীরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। কলকাতা সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলিতে এই অনৈতিক নেটওয়ার্ক গভীরভাবে শিকড় গেড়ে বসেছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি বিশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, এই গুরুতর অনিয়ম প্রকাশ্যে আসার পরেই নড়েচড়ে বসেছে রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর। তদন্তে জানা গেছে, ‘ইন্টার্নশিপ রিপ্লেসমেন্ট’ নামক একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ২৫৫ জনেরও বেশি সদস্য যুক্ত রয়েছে, যেখানে নিয়মিত শিফটের সময় এবং তার বিনিময়ে নির্দিষ্ট অর্থের পরিমাণ পোস্ট করা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শরদ্বত মুখোপাধ্যায় মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজ পরিদর্শনের সময় দেখতে পান যে, একজন এমবিবিএস ইন্টার্নের নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করছেন এক ডেন্টাল কলেজের ইন্টার্ন। এই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে এবং হাসপাতালের কড়া নজরদারির স্বার্থে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে বায়োমেট্রিক হাজিরা বাধ্যতামূলক করার কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, চিকিৎসা প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য যেখানে হাতে-কলমে রোগীর সেবা ও দায়িত্ব শেখা, সেখানে টাকার বিনিময়ে অন্যকে বসিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অগ্রহণযোগ্য।
হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, এমবিবিএস ইন্টার্নরা প্রতি মাসে প্রায় ৪০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত সরকারি উপবৃত্তি বা স্কলারশিপ পেয়ে থাকেন এবং তাঁদের শিফট সাধারণত ৬ ঘণ্টা থেকে ২৪ ঘণ্টার হয়ে থাকে। কিন্তু প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি বা ব্যক্তিগত কারণে অনেকেই সেই দায়িত্ব এড়িয়ে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রক্সি বা ভাড়ায় লোক খাটানোর মতো গুরুতর অপরাধ করছেন। যদিও অভিযুক্ত ইন্টার্নদের একাংশের দাবি, সবার কাজের চাপ অতিরিক্ত বেশি এবং সবাই এই অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত নন, তবুও স্বাস্থ্য বিভাগ সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে রোগীর সুরক্ষার সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপস করা হবে না। বায়োমেট্রিক হাজিরা চালু হলে এই বেআইনি প্রথার জাল ছিন্ন হবে এবং হাসপাতালের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।