পুজোয় নিরামিষ লাবড়া রান্নার এই সহজ কৌশল জানেন কি? একহাঁড়ি নিমিষেই শেষ হবে!

কালীপুজো মানেই বাড়িতে প্রদীপের আলো, মণ্ডপে মণ্ডপে ভিড় আর ভোগের বিশেষ আয়োজন। পুজোর ভোগে খিচুড়ি, লাবড়া, চাটনি থেকে শুরু করে নানা সুস্বাদু পদ থাকে। তবে তার মধ্যে ভিনদেশি বা সাধারণ রান্নার থেকে একেবারে আলাদা হয় ভোগের লাবড়ার স্বাদ। একাধিক মরশুমি সবজি, পাঁচফোড়ন, আদা এবং সামান্য মশলার মিশেলে তৈরি এই নিরামিষ পদটি খিচুড়ির সঙ্গে দারুণ মানিয়ে যায়। অনেক বাড়িতেই কালীপুজোর দিন ভোগ হিসেবে লাবড়া রান্না করা হয়, কিন্তু মন্দির বা পুজোর বাড়ির মতো সেই নিখুঁত স্বাদ পেতে হলে রান্নার কয়েকটি বিশেষ কৌশল মাথায় রাখা জরুরি। খুব বেশি মশলা না ব্যবহার করেও কীভাবে একদম সুস্বাদু ভোগের লাবড়া বানাবেন, দেখে নিন তার সহজ পদ্ধতি।

লাবড়া বানাতে কী কী উপকরণ লাগবে?

লাবড়ার প্রধান বিশেষত্ব হল, এতে একসঙ্গে একাধিক মরশুমি সবজি ব্যবহার করা হয়। বাড়িতে যে সবজিগুলো রয়েছে, তা দিয়েই এই পদ তৈরি করা যায়। তবে ভোগের লাবড়ায় সম্পূর্ণ নিরামিষ উপকরণ ব্যবহার করা হয় এবং এতে কোনও রকম পেঁয়াজ বা রসুন দেওয়া হয় না।

  • কুমড়ো – ২০০ গ্রাম

  • মিষ্টি আলু – ১টি মাঝারি

  • আলু – ২টি

  • বেগুন – ১টি

  • বাঁধাকপি – ২০০ গ্রাম

  • মুলো – ১টি ছোট

  • বরবটি – ৮-১০টি

  • পটল – ৩-৪টি

  • কাঁচা লঙ্কা – ৩-৪টি

  • আদা বাটা – ১ চা চামচ

  • পাঁচফোড়ন – ১ চা চামচ

  • শুকনো লঙ্কা – ২টি

  • তেজপাতা – ২টি

  • হলুদ গুঁড়ো – আধ চা চামচ

  • জিরে গুঁড়ো – আধ চা চামচ

  • ধনে গুঁড়ো – আধ চা চামচ

  • নুন – স্বাদমতো

  • চিনি – সামান্য

  • সর্ষের তেল – ৩-৪ টেবিল চামচ

  • ঘি – ১ চা চামচ

  • ভাজা জিরে গুঁড়ো – আধ চা চামচ

কীভাবে তৈরি করবেন কালীপুজোর ভোগের লাবড়া?

প্রথম ধাপ: সবজি কেটে ধুয়ে নিন

প্রথমে সব সবজি ভালো করে ধুয়ে নিন। কুমড়ো, আলু, মিষ্টি আলু, বেগুন, মুলো এবং পটল মাঝারি আকারের টুকরো করে কাটুন। বরবটি ছোট ছোট করে কেটে নিন এবং বাঁধাকপি একটু বড় করে কুচিয়ে রাখুন। লাবড়ার সবজি খুব ছোট করে কাটা একদম উচিত নয়। রান্নার সময় সবজি গলে একাকার হয়ে গেলেও প্রতিটি সবজির টুকরো যেন আলাদা করে বোঝা যায়, সেটাই এই রান্নার মূল চাবিকাঠি।

দ্বিতীয় ধাপ: সবজি হালকা ভেজে নিন

কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে প্রথমে আলু, মিষ্টি আলু এবং মুলো হালকা করে ভেজে তুলে রাখুন। এর পর বেগুন ও পটল অল্প ভেজে নিন। সবজি বেশি লাল করে ভাজার প্রয়োজন নেই। হালকা ভেজে নিলে রান্নার সময় সবজির নিজস্ব স্বাদ বজায় থাকে এবং লাবড়ার গঠনও সুন্দর হয়।

তৃতীয় ধাপ: ফোড়ন তৈরি করুন

এ বার কড়াইয়ে সামান্য তেল রেখে তাতে তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা এবং পাঁচফোড়ন দিন। পাঁচফোড়ন থেকে সুন্দর গন্ধ বেরোতে শুরু করলে আদা বাটা দিয়ে অল্পক্ষণ নাড়ুন। এর পর হলুদ গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো এবং ধনে গুঁড়ো দিয়ে সামান্য জল ছিটিয়ে মশলাগুলি ভালো করে কষিয়ে নিন। খেয়াল রাখবেন, মশলা যেন কোনোভাবেই পুড়ে না যায়।

চতুর্থ ধাপ: একে একে সবজি দিয়ে রান্না করুন

প্রথমে কড়াইয়ে ভাজা আলু, মিষ্টি আলু ও মুলো দিয়ে মশলার সঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে নিন। এর পর কুমড়ো, বরবটি, পটল, বেগুন এবং বাঁধাকপি দিয়ে দিন। সবজি নাড়াচাড়া করে স্বাদমতো নুন ও সামান্য চিনি মেশান। কাঁচা লঙ্কাও দিয়ে দিন। সবজিগুলি থেকে জল বেরোতে শুরু করলে কড়াই ঢাকা দিয়ে মাঝারি আঁচে রান্না করুন।

পঞ্চম ধাপ: লাবড়ার সঠিক টেক্সচার তৈরি করুন

সবজি সেদ্ধ হতে শুরু করলে প্রয়োজন অনুযায়ী সামান্য গরম জল দিন। তবে একসঙ্গে বেশি জল ঢালবেন না। লাবড়া খুব পাতলা হবে না, আবার একেবারে শুকনোও থাকবে না। সবজি সেদ্ধ হয়ে এলে খুন্তি দিয়ে কয়েকটি সবজি হালকা চটকে দিন। এতে লাবড়ার ঝোল ঘন হবে এবং সবজির স্বাদ গ্রেভির সঙ্গে ভালোভাবে মিশে যাবে। তবে খেয়াল রাখবেন সব সবজি যেন গলে একাকার না হয়ে যায়।

ষষ্ঠ ধাপ: শেষ মুহূর্তে ঘি ও ভাজা মশলা

সবজি পুরোপুরি সেদ্ধ হয়ে গেলে উপর থেকে সামান্য ঘি এবং ভাজা জিরে গুঁড়ো ছড়িয়ে দিন। আরও একবার ভালো করে মিশিয়ে গ্যাসের উনুন বন্ধ করে দিন। চাইলে এক চিমটি গরম মশলা গুঁড়োও দিতে পারেন। তবে আসল ভোগের লাবড়ায় অতিরিক্ত মশলার গন্ধ থাকা চলবে না। পাঁচফোড়ন, আদা এবং সবজির নিজস্ব প্রাকৃতিক মিষ্টি স্বাদই এই রান্নার আসল বৈশিষ্ট্য।

ভোগের লাবড়া সুস্বাদু করার কিছু জরুরি টিপস

লাবড়া রান্নার সময় কয়েকটি ছোট বিষয় মাথায় রাখলে এর স্বাদ বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রথমত, সবজি কখনোই খুব ছোট করে কাটবেন না। দ্বিতীয়ত, সবজি বেশি কড়া করে ভাজবেন না, এতে লাবড়ার স্বাভাবিক স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। তৃতীয়ত, এই রান্নায় ভুলেও পেঁয়াজ-রসুন ব্যবহার করবেন না। ভোগের নিরামিষ স্বাদ বজায় রাখতে সর্ষের তেল, আদা, পাঁচফোড়ন এবং ঘি-ই ভরসা। কুমড়ো ও মিষ্টি আলু লাবড়ায় একটি প্রাকৃতিক মিষ্টি ভাব এনে দেয়, তাই আলাদা করে খুব বেশি চিনি দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

এছাড়া, রান্নার সময় সবজি একসঙ্গে না দিয়ে শক্ত সবজিগুলো আগে এবং নরম সবজিগুলো পরে দিলে সবকটি সমানভাবে সেদ্ধ হয়। কুমড়ো ও বেগুন খুব আগে দিয়ে দিলে গলে পেস্ট হয়ে যেতে পারে, তাই রান্নার শেষের দিকে সেগুলি দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কালীপুজোর দিন গরম খিচুড়ি, লাবড়া এবং চাটনির এই ট্রিপল কম্বিনেশন পাতে পড়লে পুরো জমজমাট হয়ে উঠবে পুজো বাড়ির আসর।