প্রতি ৫ জনে ১ জনের জীবনে বিষাদ! ভারতে বাল্যবিবাহের হার কমলেও পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের চিত্র চরম উদ্বেগজনক

ভারতে বাল্যবিবাহের অভিশাপ ও হার ধীরে ধীরে কমতির দিকে হলেও, এই সামাজিক সমস্যাটি আজও দেশের প্রগতির পথে এক বিশাল অন্তরায় হয়ে রয়ে গিয়েছে। সাম্প্রতিক জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (NFHS-6, ২০২৩-২৪)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণীদের মধ্যে এখনও ২০.১ শতাংশের বিয়ে হয়েছে তাঁদের ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই। সহজ কথায় বলতে গেলে, আজও দেশের প্রতি পাঁচজন নারীর মধ্যে অন্তত একজনের বিয়ে হচ্ছে আইনসম্মত আইনি বয়সের আগেই।

যদিও ২০১৯-২১ সালের পূর্ববর্তী এনএফএইচএস-৫ সমীক্ষার তুলনায় এই হার ২৩.৩ শতাংশ থেকে কমে ২০.১ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ বিগত তিন বছরে দেশে বাল্যবিবাহের হার ৩.২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা কিছুটা স্বস্তির হলেও সার্বিক পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

রাজ্যওয়ারি পরিসংখ্যান: শীর্ষে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার

জাতীয় স্তরে এই হার কিছুটা কমলেও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে ব্যবধান বা তারতম্য রয়েছে আকাশ-পাতাল। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের।

  • পশ্চিমবঙ্গ: এই রাজ্যে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সি নারীদের মধ্যে প্রায় ৩৬.৪ শতাংশেরই ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগে বিয়ে হয়েছিল।

  • বিহার: এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বিহার, যেখানে অল্প বয়সে বিবাহিত মহিলার হার ৩৪.৬ শতাংশ।

অন্যদিকে, দেশের দক্ষিণের রাজ্য কেরল এই ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কেরালায় বাল্যবিবাহের হার মাত্র ২.৯ শতাংশ। এর থেকেই স্পষ্ট যে, জাতীয় গড়ের তুলনায় দেশের কিছু রাজ্যে এই সামাজিক ব্যাধি এখনও কতটা মারাত্মক রূপ নিয়ে টিকে রয়েছে।

বাল্যবিবাহের প্রধান কারণ ও নেপথ্যের প্রেক্ষাপট

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গেঁথে থাকা বেশ কিছু অন্ধবিশ্বাস এবং আর্থ-সামাজিক কারণই এর জন্য প্রধানত দায়ী। যার মধ্যে রয়েছে: ১. তীব্র দারিদ্র্য ও আর্থিক অনটন: দরিদ্র পরিবারগুলিতে কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করে অনেক সময় কম বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। ২. শিক্ষার অভাব: মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগের অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতি এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ৩. প্রথা ও কুসংস্কার: সমাজের প্রাচীন রক্ষণশীল প্রথা এবং সামাজিক চাপও এর অন্যতম প্রধান অনুঘটক।

সরকারের পরবর্তী লক্ষ্য

আইনি কড়াকড়ি এবং প্রশাসনের নানামুখী প্রচেষ্টার ফলে সামগ্রিকভাবে বাল্যবিবাহের গ্রাফ কিছুটা নিম্নমুখী হলেও, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের মতো রাজ্যগুলিতে প্রশাসনের নজরদারি আরও বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতকে সম্পূর্ণভাবে বাল্যবিবাহমুক্ত (Child Marriage Free India) করার এক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। তবে এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে কেবল আইনের শাসন নয়, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরে মানসিকতার পরিবর্তন এবং ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।