‘শিবের মতো শান্ত, কিন্তু প্রয়োজন পড়লে রুদ্র রূপ!’ দীপাবলির আলোয় বাগডোগরায় দাঁড়িয়ে শত্রুকে কড়া হুঁশিয়ারি রাজনাথের

দীপাবলির পবিত্র ও আনন্দের আবহে প্রিয়জনদের ছেড়ে দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়োজিত ভারতীয় বিমান বাহিনীর (IAF) বীর জওয়ান ও অফিসারদের সঙ্গে দীপাবলি উদযাপন করতে শিলিগুড়ির কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাগডোগরা এয়ারফিল্ডে সশরীরে উপস্থিত হলেন কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। এদিনের এই বিশেষ অনুষ্ঠানে জওয়ানদের আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘‘আমি জানি, এই উৎসবের দিনে আপনাদের সবারই বাড়ির কথা মনে পড়ছে। কিন্তু সেই স্মৃতিগুলোকে বুকে চেপে আপনারা যেভাবে দেশের নিরাপত্তায় নিরলসভাবে পাহারা দিচ্ছেন, তা অতুলনীয়। আপনাদের এই ত্যাগ ও তপস্যাকে কোনো ভাষায় শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব নয়।’’ তিনি স্পষ্ট জানান যে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা দিতে নয়, বরং নিজের পরিবারের সদস্যদের মাঝেই উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিতে এবং সেনার মনোবল বাড়িয়ে দিতেই তিনি এখানে ছুটে এসেছেন।
উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্ত সুরক্ষায় বাগডোগরা বিমানঘাঁটির কৌশলগত গুরুত্বের কথা তুলে ধরে রাজনাথ সিং একে একটি ‘শক্তিশালী বর্ম’ হিসেবে অভিহিত করেন। একইসঙ্গে তিনি সেনাকে সর্বদা সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং ‘কমব্যাট রেডিনেস’ বা যুদ্ধের প্রস্তুতিতে থাকার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। বর্তমান যুগের আধুনিক নিরাপত্তার প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন যে, আধুনিক যুদ্ধ এখন আর কেবল সীমান্তে প্রথাগত গুলিবর্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর পরিধি অনেক ব্যাপক। এর মধ্যে প্রক্সি ওয়ার, সাইবার অ্যাটাক, ড্রোন সোয়ার্ম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়ো তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির মতো নানাবিধ হাইব্রিড কৌশল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শত্রুপক্ষ সরাসরি মুখোমুখি লড়াই এড়িয়ে নানা ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে উল্লেখ করে তিনি জওয়ানদের সামরিক দক্ষতার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সচেতনতা ও সাইবার নিরাপত্তা বজায় রাখার ওপর জোর দেন। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, মানুষের সাহস এবং ইস্পাতকঠিন শৃঙ্খলাই যে যুদ্ধের আসল চাবিকাঠি, সেকথা পুনরায় মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক না কেন, জওয়ানদের মধ্যে যদি শৃঙ্খলা ও সাহস না থাকে, তবে সেই প্রযুক্তি সম্পূর্ণ অর্থহীন। শৃঙ্খলাই একজন সাধারণ সৈনিককে অসাধারণ যোদ্ধায় রূপান্তরিত করে।’’
জওয়ানদের উদ্দেশ্যে বিশেষ বার্তা দিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্থানীয় সাধারণ মানুষের সঙ্গে সবসময় আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, সেনার পরিপাটি পোশাক, মার্জিত আচরণ এবং সংযমের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে সেনার সুদৃঢ় বন্ধন গড়ে ওঠে, যা শত্রুর যেকোনো বিভাজনের চক্রান্তকে চিরতরে ব্যর্থ করে দেয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘আত্মনির্ভর ভারত’ দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলে ধরে তিনি জানান যে দেশের নিজস্ব ডিফেন্স স্টার্ট-আপ ও শিল্পগুলি এখন ড্রোন, অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম ও উন্নত সামরিক সরঞ্জাম দেশেই তৈরি করছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই সমস্ত অত্যাধুনিক সরঞ্জাম জওয়ানরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করছেন দেখে তিনি গভীর গর্ব প্রকাশ করেন।
ভাষণের শেষ পর্যায়ে অগ্নিবীরদের জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বড় ঘোষণা করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি জানান যে, ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্পে অবশিষ্ট ৭৫ শতাংশ অগ্নিবীরদের তাঁদের ইচ্ছার ভিত্তিতে আরও দুই বছরের অতিরিক্ত সেবা প্রদান করার সুযোগ দেওয়া হবে এবং পরবর্তী সময়ে যোগ্যতার ভিত্তিতে তাঁদের নিয়মিত সেনাবাহিনীতে স্থায়ীভাবে যোগদানের পথও প্রশস্ত করা হয়েছে। এটিকে তিনি জওয়ানদের জন্য দীপাবলির এক বিশেষ উপহার হিসেবে অভিহিত করেন। একইসঙ্গে সম্প্রতি বিমান বাহিনীর নবনিযুক্ত এয়ার চিফ মার্শাল আশুতোষ দীক্ষিতকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়ে রাজনাথ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে বলেন, ‘‘আমাদের সেনা ভগবান শিবের মতো শান্ত স্বভাবের, কিন্তু প্রয়োজনে তারা রুদ্র রূপ ধারণ করতে দ্বিধা করে না। শত্রুরা যেন সবসময় এটাই প্রার্থনা করে, যাতে সেই রুদ্র রূপ তাদের দেখতে না হয়।’’ পরিশেষে তিনি সমস্ত জওয়ান ও তাঁদের পরিবারবর্গের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করে অনুষ্ঠানমালার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।