সঞ্জয় গান্ধী একা নন, জরুরি অবস্থার নেপথ্যে ছিলেন দলের প্রবীণ নেতারাও! বিস্ফোরক দাবি সোনিয়া গান্ধীর

১৯৭৫ সালের দেশজুড়ে কুখ্যাত জরুরি অবস্থার সময় ঘটে যাওয়া যাবতীয় অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সমস্ত দায় এককভাবে সঞ্জয় গান্ধীর ঘাড়ে চাপাতে সম্পূর্ণ নারাজ কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। আগামী ১০ নভেম্বর বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত হতে চলেছে তাঁর অত্যন্ত প্রতীক্ষিত আত্মজীবনী ‘Belonging: A Journey Of Love’। তার ঠিক প্রাক্কালে এক বেসরকারি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় নিয়ে মুখ খুলেছেন তিনি। সোনিয়ার এই চাঞ্চল্যকর দাবি ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র চর্চা ও বিতর্কের ঝড় উঠেছে।

সাক্ষাৎকারে সোনিয়া গান্ধী দাবি করেছেন যে, জরুরি অবস্থার সময় ঘটে যাওয়া সমস্ত বিতর্কিত ঘটনার জন্য শুধুমাত্র সঞ্জয় গান্ধীকে দায়ী করা একেবারেই অনুচিত। তাঁর মতে, জরুরি অবস্থার সঙ্গে সঞ্জয় গান্ধীর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকলেও পেছনের বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ছিল। সেই সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ওপর তাঁর দলেরই বেশ কয়েকজন প্রবীণ ও প্রভাবশালী নেতার পক্ষ থেকে প্রবল রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। সোনিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, সেই কঠিন সময়ে রাজীব গান্ধী সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন অভিযোগ এবং ক্ষোভের কথা সরাসরি তাঁর মা ইন্দিরা গান্ধীকে জানাতেন। পরবর্তীতে ইন্দিরা গান্ধী নিজের রাজনৈতিক উপলব্ধি ও বিচারবুদ্ধি দিয়ে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারেন এবং ভুল সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

জরুরি অবস্থাকে সরাসরি গণতন্ত্রবিরোধী আখ্যা দেওয়া যায় কি না, সেই প্রশ্নের মুখে পড়ে সোনিয়া গান্ধী খোলামেলা স্বীকার করেছেন যে, ওই সময় দেশবাসীর গণতান্ত্রিক অধিকার মারাত্মকভাবে খর্ব করা হয়েছিল। তিনি বলেন, জরুরি অবস্থার সময় ঠিক কী ধরনের ঘটনা ঘটছিল, তার প্রকৃত গুরুত্ব তিনি নিজেও অনেক পরে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। সেই অন্ধকার দিনে নাগরিকদের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার সীমিত করার পাশাপাশি ‘হেবিয়াস কর্পাস’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ অধিকারও স্থগিত রাখা হয়েছিল। তবে তাঁর দাবি, সেই সমস্ত কঠোর সিদ্ধান্ত তৎকালীন সাংবিধানিক কাঠামোর পরিধির মধ্যেই নেওয়া হয়েছিল।

জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সোনিয়া জানান যে, সত্তরের দশকের সেই অশান্ত সময়ে দেশে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছিল। দেশজুড়ে বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক বিক্ষোভ, সরকারি দপ্তর ও গণপরিবহণে অগ্নিসংযোগ এবং লাগাতার সহিংসতার ঘটনা ঘটছিল। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে প্রশাসন ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও সরকারের নির্দেশ অমান্য করার প্রকাশ্য বার্তা দেওয়া হচ্ছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলেই দাবি করেছেন তিনি।

তবে জরুরি অবস্থার সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক পরিণতি ও কঠোরতার সমালোচনা সম্পর্কে পরবর্তী সময়ে ইন্দিরা গান্ধী নিজে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন বলেই জানান সোনিয়া। তাঁর স্পষ্ট কথা, ইন্দিরা গান্ধী নিজেই বুঝতে পেরেছিলেন যে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে আচমকা লোকসভা নির্বাচনের ডাক দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, জরুরি অবস্থার সময় ঘটে যাওয়া অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা বাড়াবাড়ির জন্য পরবর্তীকালে তিনি প্রকাশ্যেই দেশবাসীর কাছে দুঃখপ্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছিলেন। প্রসঙ্গত, ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন। যার জেরে প্রশাসনের হাতে লাগামছাড়া ক্ষমতা চলে আসে, সংবাদমাধ্যমের উপর কঠোর সেন্সরশিপ জারি হয় এবং অবশেষে ১৯৭৭ সালের ২১ মার্চ সেই কালো অধ্যায়ের অবসান ঘটেছিল।