দুধে ভেজাল দিলেই কড়া শাস্তি! বিহারে ৪টি নতুন ল্যাব গড়ছে সরকার, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যে জিরো টলারেন্স নীতি

বিহারজুড়ে খাদ্য ভেজালকারীদের দৌরাত্ম্য রুখতে রাজ্য সরকার খাদ্য সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কঠোর ও গতিশীল করার ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এবার থেকে রাজ্যের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গে আপসকারী অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে লাগাতার অভিযান চালানো হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিশান্ত কুমার সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণায় জানিয়েছেন যে, পূর্ণিয়া, ভাগলপুর, মুজাফফরপুর এবং মুঙ্গের—এই চারটি প্রধান শহরে অত্যাধুনিক নতুন খাদ্য পরীক্ষাগার (Food Testing Laboratories) স্থাপন করা হবে। এর ফলে বিশেষ করে সীমাঞ্চল অঞ্চলের সাধারণ মানুষ খাদ্যের মান পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিরাট স্বস্তি পাবেন। সরকারের এই পদক্ষেপে প্রমাণিত হয় যে, জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই আপস করা হবে না এবং ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
নতুন এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, খাদ্য নিরাপত্তা অভিযান আর কেবল দিওয়ালি, ছট পূজা বা অন্যান্য উৎসবের মরশুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি সারা বছর ধরে অবিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হবে। সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ২৬ জন নবপ্রশিক্ষিত খাদ্য সুরক্ষা কর্মকর্তাকে তাদের ৪০ দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করার পর শংসাপত্র প্রদান করেছেন। এই সমস্ত আধিকারিকদের বিহারের প্রতিটি জেলায় পদায়ন করা হয়েছে, যার ফলে রাজ্যের সমস্ত জেলায় খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিকদের সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত হবে। এর ফলে জেলার মিষ্টির দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ, ডেইরি ফার্ম, মুদি দোকান এবং বড় বড় খাদ্য উৎপাদন কেন্দ্রগুলিতে নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি করা সম্ভব হবে।
পূর্ণিয়ায় নতুন খাদ্য পরীক্ষাগার স্থাপন করার সিদ্ধান্তটি সীমাঞ্চল অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এতদিন পর্যন্ত এই অঞ্চলে উন্নত খাদ্য পরীক্ষার ল্যাবের অভাব ছিল। নতুন মৌলিক পরীক্ষাগারগুলি চালু হলে দুধ, পনির, ভোজ্য তেল, মশলা এবং শস্যের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের প্রাথমিক পরীক্ষা খুব সহজেই স্থানীয় স্তরে সম্পন্ন করা যাবে। এর ফলে সন্দেহজনক বা ভেজাল খাদ্যদ্রব্য দ্রুত চিহ্নিত করে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্য বিভাগ এই ল্যাবগুলি স্থাপনের জন্য দ্রুত জমি চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি পাটনার বিদ্যমান প্রধান খাদ্য পরীক্ষাগারটিরও ব্যাপক সংস্কার চলছে এবং রাজ্যের নয়টি বিভাগীয় সদর দফতরে অণুজীববিজ্ঞান (Microbiology) পরীক্ষাগার স্থাপনের পরিকল্পনাও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
উল্লেখ্য, বিহারের বিভিন্ন জেলায় আগস্ট থেকে নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত একটি বিশেষ খাদ্য নিরাপত্তা পরিদর্শন অভিযান চালানো হয়েছিল। এই বিশেষ অভিযানে শেখপুরা, জামুই, লক্ষীসরাই, খাগরিয়া, নালন্দা, নওয়াদা, দারভাঙ্গা, মধুবনী, গয়া, ভাগলপুর, কাটিহার, মুজাফফরপুর, পাটনা, পূর্ণিয়া, আরারিয়া, কিষাণগঞ্জ, সহরসা, সুপল, মধুবনী ও পশ্চিম চম্পারণসহ রাজ্যের বহু এলাকায় দোকান ও প্রতিষ্ঠানগুলিতে হানা দেওয়া হয়। এই অভিযান চলাকালীন দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, মিষ্টি, শস্য, ডাল, মশলা, সস, ভোজ্যতেল, কোল্ড ড্রিংকস, জুস এবং প্যাকেটজাত পানীয় জলের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে অস্বাস্থ্যকর, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ পনির, ছানা, পেড়া ও সোনপাপড়ির মতো খাদ্যসামগ্রী হাতেনাতে ধরে ঘটনাস্থলেই সেগুলি ধ্বংস করা হয়েছে।
শুধুমাত্র মিষ্টি বা দুধ নয়, প্যাকেটজাত পানীয় জল প্রস্তুত ও বিক্রিকারী প্রতিষ্ঠানগুলির ওপরও কড়া নজরদারি রাখা হচ্ছে। এফএসএসএআই (FSSAI) লাইসেন্স, প্যাকেজিং, ব্যাচ নম্বর এবং লেবেলিংয়ের মান যাচাই করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলিকে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে, নিরামিষ ও আমিষ খাবার আলাদা রাখতে এবং ফিফো (ফার্স্ট-ইন, ফার্স্ট-আউট) পদ্ধতি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সচিব ও খাদ্য সুরক্ষা কমিশনার কুমার রবি পরিষ্কার জানিয়েছেন যে, পরিদর্শনের সময় ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি নিয়ম না মানলে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। সরকার সাধারণ মানুষকেও অনুরোধ করেছে যেকোনো খাদ্যদ্রব্য কেনার সময় তার মেয়াদ ও লাইসেন্স যাচাই করে নিতে এবং ভেজাল দেখলে অবিলম্বে প্রশাসনকে অবহিত করতে।