কারখানা বন্ধ করলেই সোজা ১৫ মিনিটে জেল! নতুন শিল্পনীতি ঘোষণা করে বাম-তৃণমূলকে চরম হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর

পশ্চিমবঙ্গে নতুন শিল্পনীতি ঘোষণার পর রাজ্যজুড়ে এক ঐতিহাসিক ও দৃষ্টান্তমূলক বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নিউটাউনের ইকো পার্কে আয়োজিত ‘পশ্চিমবঙ্গ বিনিয়োগ প্রসার নীতি ২০২৬’-এর উদ্বোধনী মঞ্চ থেকে শিল্প ও কর্মসংস্থানের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি রাজ্যের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি বিশেষ করে তৃণমূল ও সিপিএমকে নিশানা করে চরম কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অতীতে কারখানার গেটে তালা ঝুলিয়ে বা রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব খাটিয়ে শিল্পকে পণবন্দি করার যে নোংরা সংস্কৃতি চলেছে, তা এবার চিরতরে বন্ধ করা হবে। কারখানার কাজ বন্ধ করার চেষ্টা করলেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ করা হবে এবং অভিযোগ পাওয়ার মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে তাঁদের সোজা জেলে পাঠানো হবে।
বৃহস্পতিবারের এই জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, শ্রমিকদের যে কোনো বৈধ অভিযোগ বা অভাব-অভিযোগ থাকলে তা সরাসরি লেবার কমিশনারের মাধ্যমে আলোচনার টেবিলে সমাধান করতে হবে। কিন্তু জোর করে কাজ বন্ধ করে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির পুরনো সংস্কৃতি বাংলায় আর বরদাস্ত করা হবে না। তাঁর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা, ‘‘যাঁরা কাজ বন্ধ করবেন, তাঁদের কাজ চিরতরে বন্ধ করে দেব, অনেকদিন জেলে থাকতে হবে।’’ দীর্ঘদিন ধরে বাম আমলের অতিরিক্ত ট্রেড ইউনিয়নবাজি এবং পরবর্তী সময়ে সিন্ডিকেট রাজ ও রাজনৈতিক জটিলতার কারণে বঙ্গবাসীর যে শিল্পমুখী স্বপ্ন অধরা থেকে গিয়েছিল, বর্তমান সরকারের এই মেগা নীতি সেই অন্ধকার চিত্র পুরোপুরি পাল্টে দেবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক ও শিল্প মহল।
নতুন এই শিল্পনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে পাখির চোখ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট মূলধনি বিনিয়োগের ওপর ১০০ থেকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত আর্থিক সহায়তার বিশেষ ব্যবস্থার ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র এবং থ্রাস্ট সেক্টরের ক্ষেত্রে এই প্রণোদনার পরিমাণ আরও অনেকটাই বেশি রাখা হয়েছে। নারী ও ট্রান্সজেন্ডার কর্মীদের কর্মসংস্থানকে উৎসাহিত করতে তাঁদের ইপিএফ (EPF) অবদানের সম্পূর্ণ অর্থ প্রতিদান দেওয়ার যুগান্তকারী ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। শিল্প স্থাপনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা দূর করতে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমস্ত ছাড়পত্র প্রদান এবং ল্যান্ড ব্যাংকের মাধ্যমে দ্রুত জমি বন্দোবস্ত করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, সিঙ্গুরের সেই ঐতিহাসিক ও পরিত্যক্ত জমিতে এবার নতুন করে শিল্পদ্যোগ গড়ে তোলার জোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সিঙ্গুরের পুরনো মাটিতে অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে ইতিমধ্যেই প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। টাটা ন্যানো প্রকল্পের বিদায়ের পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা সেই জমিতে নতুন আলো জ্বালাতে বদ্ধপরিকর সরকার। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে রাজ্যবাসীর জন্য প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ রাজ্যে টেনে আনার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ শুরু করেছে প্রশাসন।
অবশ্য শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতেও লেবার কমিশনের ভূমিকা আরও অনেক বেশি শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে। তবে বৈধ অভিযোগের নিষ্পত্তির নামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কারখানা বন্ধ রাখা কিংবা জোর করে গেট আটকে রাখার মতো বেআইনি অপচেষ্টা চালালে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার দিন আর নেই। তোলাবাজি ও চাঁদা তোলার সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, রাজ্য এখন সম্পূর্ণভাবে ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত। দীর্ঘতম রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে বাংলার মাটিতে প্রকৃত শিল্পবান্ধব পরিবেশ ফিরে আসার এই ঘোষণাকে ইতিমধ্যেই দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতিরা একবাক্যে স্বাগত জানিয়েছেন। এখন দেখার, এই ঝাঁ-চকচকে নীতি বাস্তবে মাটির বুকে কতটা সফলভাবে রূপায়িত হয়।