“১২ বছরে দারিদ্র মুক্ত ৫০ কোটি”-মোদীর মেগা ঘোষণায় শোরগোল দেশে!

গত এক দশকে ভারতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিত্রে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বব্যাঙ্কের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মঙ্গলবার এক জনসভায় দাবি করেছেন যে, গত ১০ থেকে ১২ বছরে ভারতের প্রায় ৫০ কোটি মানুষ চরম দারিদ্রের কবল থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। অতীতে দেশের দারিদ্র দূরীকরণের লড়াই মূলত রাজনৈতিক দলগুলির ফাঁপা স্লোগান এবং প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার সুনির্দিষ্ট উন্নয়নমূলক প্রকল্প, কল্যাণমুখী যোজনা এবং সুপরিকল্পিত পরিকাঠামোয় ভারী বিনিয়োগের মাধ্যমে বাস্তবে দারিদ্র মোকাবিলার কাজ করে চলেছে।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, দেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সঙ্গে দারিদ্র কমার হার সরাসরি যুক্ত। রাস্তাঘাট, রেলওয়ে নেটওয়ার্ক, বিমানবন্দর, আধুনিক মেট্রো পরিষেবা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, প্রতিটি ঘরে পানীয় জল এবং রান্নার গ্যাসের মতো প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর উন্নয়ন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান কেবল উন্নতই করছে না, একই সঙ্গে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের অপার সুযোগ তৈরি করছে।
এ দিন মহারাষ্ট্রের পুনেতে মেট্রোর অত্যাধুনিক পিঙ্ক লাইন বা তৃতীয় মেট্রো করিডরের শুভ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। ভিডিয়ো কনফারেন্সের মাধ্যমে ২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নতুন মেট্রোপথের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি জানান যে, ২০১৪ সালের আগে সমগ্র দেশে চালু মেট্রো নেটওয়ার্কের মোট দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ২৪৮ কিলোমিটার, যা বর্তমান সরকারের আমলে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১২০০ কিলোমিটারে পৌঁছেছে। তাঁর মতে, মেট্রো পরিষেবার এই অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ দেশের শহরাঞ্চলের যাতায়াত ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিয়েছে। উন্নত শহুরে পরিকাঠামো ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। ২০১৪ সালে এনডিএ জোট সরকার দেশের শাসনভার গ্রহণ করার পর থেকেই শহরের মধ্যবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজতর করা এবং যাতায়াতের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছিল।
শহরের সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে মেট্রো পরিষেবার গুরুত্ব বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, বর্তমান যুগে কোনও শহরের পরিচিতি কেবল তার শিল্প বা উৎপাদিত পণ্যের ওপর নির্ভর করে না। বরং শহরের প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা, উন্নত পরিকাঠামো এবং নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান এখন সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মেট্রো পরিষেবা চালু হলে মানুষের দীর্ঘ যাতায়াতের সময় যেমন বাঁচে, তেমনই দৈনন্দিন জীবন অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ হয়। শহরের মানুষের মূল্যবান সময় বাঁচলে তাঁদের কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, যার সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এবং এর ফলে বিশেষভাবে উপকৃত হন দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত সমাজ। বর্তমানে ভারতের মেট্রো নেটওয়ার্ক বিশ্বজুড়ে প্রথম তিনটি দেশের তালিকার মধ্যে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে।
দেশের শহরাঞ্চলের পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের দূরদর্শী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে নরেন্দ্র মোদী জানান যে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কেন্দ্র ১ লক্ষ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক সহায়তার ‘আরবান চ্যালেঞ্জ ফান্ড’ অনুমোদন করেছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই বিশেষ তহবিলের সদ্ব্যবহার করে শহরের পরিকাঠামো উন্নয়নে আরও বিপুল বিনিয়োগ টানার সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। শুধু মেট্রো সিটি বা বড় শহরগুলিই নয়, দেশের কয়েকশো ছোট শহরকেও আগামিতে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন তিনি। এই মহৎ উদ্দেশ্যে পুরসভা, স্থানীয় প্রশাসন এবং বেসরকারি সংস্থাগুলিকে একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, সরকার ও বেসরকারি ক্ষেত্রের যৌথ সহযোগিতায় দেশের উন্নয়নের গতিধারা আরও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
দারিদ্র দূরীকরণ প্রসঙ্গে আরও আলোকপাত করে মোদী জানান যে, তাঁর সরকারের মূল লক্ষ্য কেবল দরিদ্র মানুষকে নামমাত্র আর্থিক সাহায্য প্রদান করা নয়, বরং তাদের সুদৃঢ়ভাবে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তৈরি করে দেওয়া। দরিদ্র পরিবারের জন্য পাকা বাড়ি নির্মাণ, শৌচালয় তৈরি, ঘরে ঘরে নলবাহিত পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া এবং রান্নার গ্যাসের সংযোগ সুনিশ্চিত করার মতো জনমুখী প্রকল্পগুলি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এই সমস্ত সুবিধার ফলে মানুষের মূল্যবান সময় বাঁচে, জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় এবং অতিরিক্ত উপার্জনের নতুন পথ প্রশস্ত হয়। তাঁর ভাষায়, “মানুষকে কেবল ত্রাণ বা সাহায্য নয়, বরং নিজের চেষ্টায় দারিদ্রকে চিরতরে কাটিয়ে ওঠার আত্মিক শক্তি ও পরিকাঠামো দিতে হবে।” অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং দারিদ্র হ্রাস পরস্পর পরিপূরক। তাই পরিকাঠামোয় রেকর্ড বিনিয়োগ এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সমন্বিত রূপায়ণে উন্নয়নের সুফল সমাজের শেষ প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই সরকারের প্রধান অঙ্গীকার।