ট্রাম্পের দেশে বাজিমাত! মার্কিন নির্বাচনে ইতিহাস গড়ে কোন বড় রাজনৈতিক বার্তা দিলেন আসাদউদ্দিন ওয়েসি?

আমেরিকার রাজনীতিতে এক নতুন ইতিহাস রচিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেট সেনেট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী আবদুলরহমান মোহাম্মদ আল-সৈয়দ এক ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন। মার্কিন উচ্চকক্ষ বা সেনেটের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়া তিনি প্রথম কোনো মুসলিম ব্যক্তি, যা মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক। আর আমেরিকার মাটির এই ঐতিহাসিক বিজয়ের সুদূরপ্রসারী প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়েছে ভারতের রাজনৈতিক আঙিনায়। মার্কিন এই পালাবদলের রেশ ধরেই অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (AIMIM)-এর প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েসি উত্তরপ্রদেশের সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজকে উদ্দেশ্য করে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও জোরালো রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন।

আমেরিকার মাটিতে এই বিজয়ের উদযাপনের রেশ টেনে ওवैসি ভারতের উত্তরপ্রদেশের মুসলিমদের নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি ও ঐক্য মজবুত করার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি খোলাখুলি বলেন যে, মিশিগানে যখন একজন ‘অब्दুল’ সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে জয়ী হতে পারে, তখন উত্তরপ্রদেশের ‘অब्दুল’-দেরও নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় ও অধিকারের জায়গা পোক্ত করতে হবে। সমালোচকরা বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা অতীতে ‘অब्दুল’ শব্দটিকে যেভাবে একটি কটূক্তি বা তাচ্ছিল্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে, তার তীব্র সমালোচনা করে ওয়েসি বলেন যে, সময় এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আজ উপযুক্ত সময় এসেছে সারা বিশ্বকে এটা দেখিয়ে দেওয়ার যে, ‘অब्दুল’ সর্বশক্তিমান আল্লাহ ছাড়া আর কারোর সামনে মাথা নত করে না। এখন থেকে আর চুপচাপ কোণঠাসা হয়ে বসে থাকার দিন নেই।

কে এই আবদুলরহমান মোহাম্মদ আল-সৈয়দ?

মিসিগান নির্বাচনে ইতিহাস গড়া এই তরুণ নেতা আল-সৈয়দ অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত। তিনি মিশিগান ইউনিভার্সিটি এবং মর্যাদাপূর্ণ কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের (মেডিকেল) পাঠ শেষ করেছেন এবং রোডস স্কলার হিসেবে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে সৈয়দ, সারা জাকাকুকে বিয়ে করেছেন, যাঁদের পরিবার ভারতীয় মূলের। রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে সৈয়দ নিজেকে একজন পুঁজিবাদী (ক্যাপিটালিস্ট) হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। তাঁর এবারের নির্বাচনী প্রচারের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ হ্রাস করা এবং জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন জরুরি ইস্যু। এর আগে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির নির্বাচনী প্রচার পদ্ধতি দ্বারা তিনি যথেষ্ট অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সবার জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা ব্যবস্থা তথা ‘মেডিকেয়ার’, ইজরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং নির্বাচনী অর্থায়ন বা ক্যাম্পেন ফাইন্যান্স ব্যবস্থার সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জনমুখী ইস্যুতে তিনি প্রচার চালিয়েছিলেন।

মিশিগানের ডেমোক্রেটিক গভর্নর পদের প্রাইমারি নির্বাচনে কুড়ি শতাংশেরও বেশি ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার দীর্ঘ সাত বছর পর আল-সৈয়দ অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করেছেন। এর আগে ২০১৮ সালের গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে গ্রেচেন হুইটমারের কাছে পরাজিত হওয়ার পর তিনি সাময়িকভাবে রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়েছিলেন। সেই বিরতির সময়ে তিনি একটি নিজস্ব পডকাস্ট শুরু করেন, একটি বই লেখেন এবং ইউটিউব ও বিভিন্ন জাতীয় টেলিভিশনে নিয়মিত মুখ দেখাতে শুরু করেন। তাঁর এই দীর্ঘ সংগ্রাম ও কামব্যাক তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণামূলক হয়ে উঠেছে।

এদিকে, আমেরিকার মাটিতে অন্য এক প্রান্তে আরও এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুখ বড় সাফল্য অর্জন করেছেন। ফ্লোরিডা থেকে মার্কিন হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস বা প্রতিনিধি সভার নির্বাচনে দুর্দান্ত জয় পেয়েছেন ভারতীয়-মার্কিন কন্যা প্রিয়া ডান্ডিয়া। ফ্লোরিডার ২২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডেমোক্রেটিক পার্টির টিকিটে লড়ে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী কেসি আসকারকে পরাজিত করেছেন। গত মঙ্গলবার ঘোষিত মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে যে, প্রাক্তন হাইস্কুল প্রিন্সিপাল প্রিয়া ডান্ডিয়া মোট ভোটের ৫১.৯ শতাংশ পেয়ে জয় নিশ্চিত করেছেন, যেখানে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দী আসকার পেয়েছেন ৪৯.১ শতাংশ ভোট।

নির্বাচনী প্রচারের তথ্যানুযায়ী, প্রিয়া ডান্ডিয়া হলেন প্রথম প্রজন্মের আমেরিকান। কর্মজীবনে তিনি একজন সফল হাইস্কুল প্রিন্সিপাল, নীতি নির্ধারক (পলিসি লিডার) এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবক হিসেবে নিজের কমিউনিটিকে শক্তিশালী করার কাজে ব্রতী ছিলেন। ফ্লোরিডার পাম বিচ কাউন্টিতে জন্ম নেওয়া এবং বেড়ে ওঠা প্রিয়া নিজের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন একজন সাধারণ শিক্ষক হিসেবে। পরবর্তীতে তিনি নিউইয়র্কের হার্লেমে একটি হাই স্কুলের প্রিন্সিপাল হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। কম আয় সম্পন্ন পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার মান উন্নত করতে এবং তাদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে তিনি একটি নতুন হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর এই উদ্যোগ দারুণভাবে সফল হয়। নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তাঁর গড়া সেই স্কুলের সমস্ত গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিল, যেখানে ওই স্কুলের ৮৬ শতাংশ ছাত্রছাত্রীই অত্যন্ত গরিব পরিবারের সন্তান ছিল। মাত্র ২৮ বছর বয়সে প্রিয়া ওই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন, যা তাঁকে দেশের অন্যতম কনিষ্ঠ হাইস্কুল প্রিন্সিপালদের সারিতে বসিয়েছিল।