“রীতিমতো সমস্যা হলেও সন্তানকে ইংরেজি স্কুলেই কেন পাঠাচ্ছেন কোটি কোটি বাবা-মা?” আসল সত্য জানলে চমকে যাবেন!

ভারতের লক্ষ লক্ষ পরিবারের কাছে সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ানো যেন এক অবধারিত ট্রেন্ড। কিন্তু কেন এই অন্ধ ঝোঁক? সম্প্রতি সন্তোষ নায়েবের লেখা এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক অদ্ভুত ও গভীর সামাজিক দ্বন্দ্বের চিত্র। যেখানে একদিকে রয়েছে শিক্ষার বাস্তব সুফল, আর অন্যদিকে রয়েছে ভবিষ্যতের আর্থিক সুরক্ষার লড়াই।
বাস্তব বনাম উচ্চাশার দ্বন্দ্ব: একটি ছোট শহরের এক মা নিজের মেয়েকে স্থানীয় ভাষার সরকারি স্কুল থেকে ছাড়িয়ে ইংরেজি মাধ্যমের এক বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করালেন। অথচ মেয়েটি তখনও সাবলীলভাবে ইংরেজি বলতে পারে না, বাড়ির পরিবেশও সে অনুকূল নয়। প্রথম বছরেই ক্লাসের পড়া বুঝতে বাচ্চার যথেষ্ট সমস্যা হয়, মা বিষয়টি জেনেও এই কঠিন সিদ্ধান্ত নেন।
দেশের লক্ষ লক্ষ বাবা-মায়ের এই সিদ্ধান্তকে নিছক সামাজিক বা ভনিতা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এর পেছনে রয়েছে দুটি পরস্পরবিরোধী বাস্তবতার লড়াই। একদিকে শিক্ষাবিদদের মতে, শিশুরা মাতৃভাষায় সবচেয়ে ভালো শেখে। অন্যদিকে ভারতে উচ্চশিক্ষা, কর্পোরেট চাকরি এবং আর্থিক উন্নতির চাবিকাঠি বলে মনে করা হয় একমাত্র ইংরেজিকেই।
পরিসংখ্যান কী বলছে? আজিম প্রেমজি ফাউন্ডেশনের একটি গবেষণা বলছে, ২০১৪-১৫ সালে সরকারি স্কুলে ভর্তির হার যেখানে ৫৬.৮ শতাংশ ছিল, ২০২৩-২৪ তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫০ শতাংশে। অর্থাৎ অভিভাবকরা দ্রুত ছুটছেন বেসরকারি স্কুলের দিকে। এর মধ্যে ১৬ শতাংশ পরিবার স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের কাছে ইংরেজি মাধ্যমই ছিল স্কুল বদলের মূল কারণ।
কিন্তু এখানেই রয়েছে বড় ধাক্কা। ৫২ শতাংশ স্কুল নিজেদের ‘ইংরেজি মাধ্যম’ বলে দাবি করলেও, আদতে মাত্র ২৫ শতাংশ স্কুলে সঠিক নিয়মে ইংরেজিতে পড়ানো হয়। অর্থাৎ, যে পরিচয়ের জন্য অতিরিক্ত টাকা খরচ করছেন অভিভাবকরা, তার ছিটেফোঁটাও অনেক সময় জোটে না।
ASER-এর রিপোর্ট ও এনইপি (NEP)-এর সুপারিশ: ASER-এর তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ ভারতের পঞ্চম শ্রেণির প্রতি চারজনে মাত্র একজন সাধারণ ইংরেজি বাক্য পড়তে পারে। অষ্টম শ্রেণীতেও সেই হার মাত্র দুই জনের মধ্যে একজন।
এই সমস্যার সমাধানে ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) সুপারিশ করেছিল, অন্তত পঞ্চম বা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষাতেই প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া উচিত। বিশ্বজুড়ে গবেষণায় প্রমাণিত যে শিশুরা যে ভাষায় চিন্তা করে, সেই ভাষায় পড়লে গণিত বা অন্যান্য ধারণার ভিত অনেক শক্ত হয়। নীতিটির উদ্দেশ্য ইংরেজি ভাষাকে নিষিদ্ধ করা নয়, বরং তাকে একটি ‘বিষয়’ হিসেবে ভালোভাবে শেখানো, কিন্তু সব বিষয় শেখার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে নয়।
কেন তবু ইংরেজিকেই আঁকড়ে ধরছেন অভিভাবকরা? তাত্ত্বিক আলোচনা যাই হোক না কেন, এ দেশের চাকরির বাজারের নিষ্ঠুর বাস্তব অন্য কথা বলে। অধিকাংশ কর্পোরেট সংস্থায় চাকরি, বড় বড় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বা উচ্চশিক্ষায় ইংরেজির প্রভাব একচ্ছত্র। তাই কোনো অভিভাবক যখন সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যমে দেন, তখন তিনি কেবল আভিজাত্য দেখান না, বরং সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার কথা ভাবেন। বিশেষ করে যে পরিবারে সন্তানই প্রথম কোনো ভালো পেশায় পা রাখতে চলেছে, তাদের কাছে এই ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম।
পরিশেষে বলা যায়, স্কুলটিতে যদি সত্যিই ইংরেজি শেখানোর পরিকাঠামো ও সঠিক সহযোগিতা থাকে, তবে সাময়িক কষ্ট হলেও সেই ভাষা একদিন শিশুর কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি তা কেবলই ‘নামসর্বস্ব টকমা’ হয়, তবে বিপদের ঝুঁকি থেকেই যায়।