ধানের জমিতে জমা জলই আনছে লক্ষ্মী লাভ! পূর্ব মেদিনীপুরের কৃষকদের এই যুগান্তকারী চাষ দেখলে চমকে যাবেন!

পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কৃষি মানচিত্রে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রধান ও স্থায়ী সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে যত্রতত্র জল জমার অসহ্য যন্ত্রণা। বর্ষাকালের অতিবৃষ্টি এবং জলমগ্ন পরিস্থিতির জেরে প্রতি বছর হাজার হাজার বিঘা জমির আমন ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতো জেলার অন্নদাতা কৃষকদের। কিন্তু এই প্রতিকূল অবস্থাকেই নিজেদের জেদ ও বুদ্ধিমত্তার জোরে সুযোগে পরিণত করেছেন পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দকুমার ও তমলুক ব্লকের কৃষকরা। ধান চাষ কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠায় তাঁরা বাধ্য হয়ে এক অভিনব ও লাভজনক বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছেন পানিফল (Water Chestnut) চাষ। আর তাঁদের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই এখন জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন বিপ্লব ঘটিয়ে সাধারণ কৃষকদের মুখে চওড়া হাসি ফুটিয়েছে।

বিশেষ করে তমলুক ব্লকের পূর্বানূখা, পুতপুতিয়া মিরিকপুর এবং নন্দকুমারের বলরামপুর, ইড়খা ও কোলসরসহ বিভিন্ন গ্রামের বিস্তীর্ণ জলমগ্ন ও নিচু জমিতে এখন পুরোদমে চলছে পানিফলের বাম্পার চাষ। পানিফল চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি অতিরিক্ত জল বা দীর্ঘমেয়াদী জল জমার কারণে নষ্ট হয় না, বরং জলা জমিতেই এর ফলন সবচেয়ে দুর্দান্ত হয়। এই চাষের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় কৃষক জন্মজয় দাস ও সূর্য দাসের মতো অভিজ্ঞ চাষিরা জানাচ্ছেন যে, প্রথাগত ধান চাষের তুলনায় পানিফল চাষে ক্ষতির ঝুঁকি প্রায় নেই বললেই চলে। আষাঢ় মাসের শুরুতেই এই বিশেষ চাষ শুরু করতে হয় এবং আশ্বিন মাস থেকে শুরু করে অগ্রহায়ণ মাসের শেষ পর্যন্ত এর ফলন ও ফসল ঘরে তোলা যায়। সাধারণত প্রতি কাঠা জমিতে প্রায় দেড় থেকে দুই কুইন্টাল পর্যন্ত পানিফল উৎপাদিত হয়। বর্তমান বাজারে পাইকারি ও খুচরো দরে এই ফল প্রতি কেজি ৪০ টাকা থেকে ৬০ টাকা দরে অবলীলায় বিক্রি হচ্ছে।

হিসাব কষে দেখা গেছে, এই চাষে আনুমানিক ৩০ হাজার টাকা খরচ হলেও ফসলের বিক্রি থেকে অনায়াসে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ, প্রতি বিঘা জমিতে সমস্ত খরচ বাদ দিয়েও নিখাদ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বা তারও বেশি লাভ ঘরে তুলছেন চাষিরা। শুধু আর্থিক লাভই নয়, পুষ্টিগুণে ভরপুর এই পানিফল মানবদেহের জলের ঘাটতি পূরণ করা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শরীরে প্রচুর পরিমাণে প্রয়োজনীয় ক্যালোরি সরবরাহ করার মতো একাধিক ঔষধিগুণে সমৃদ্ধ। সবমিলিয়ে, প্রথাগত ধানের বদলে জলার জমিতে পানিফল চাষের এই অসামান্য সাফল্য পূর্ব মেদিনীপুরের কৃষকদের জন্য এক সুদূরপ্রসারী এবং লাভজনক পথ উন্মুক্ত করেছে।