ব্যালট পেপারেও ধাক্কা! চার রাজ্যের বিধান পরিষদ নির্বাচনে কোন হেভিওয়েটদের আসন হাতছাড়া হল জানুন!

চার রাজ্যের বিধান পরিষদ বা এমএলসি (MLC) নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ্যে আসতেই জাতীয় রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র জল্পনা। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র এবং কর্নাটকের মোট ২৮টি শিক্ষক ও স্নাতক (Graduates & Teachers) আসনে গত ২৩ অক্টোবর ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছিল। প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলগুলির জন্য যেমন কিছু স্বস্তির খবর রয়েছে, তেমনই বেশ কিছু অপ্রত্যাশিত ধাক্কা শাসক শিবিরের অন্দরে বড়সড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কর্নাটক এবং বিহারের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কর্নাটকের রাজনৈতিক ময়দানে কংগ্রেস দল ক্ষমতায় থাকলেও, এবারের এমএলসি নির্বাচন শাসক শিবিরের জন্য এক বিরাট বিপর্যয় ডেকে এনেছে। রাজ্যের চারটি আসনেই নিরঙ্কুশ জয় ছিনিয়ে নিয়েছে বিজেপি ও জেডিএস (JDS)-এর এনডিএ জোট। এর মধ্যে বিজেপি জিতেছে তিনটি আসনে—যথা নর্থ-ইস্ট টিচার্স, ওয়েস্ট গ্র্যাজুয়েটস এবং সাউথ-ইস্ট গ্র্যাজুয়েটস। অন্যদিকে, তাদের শরিক দল জেডিএস দখল করেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেঙ্গালুরু টিচার্স আসনটি। খোদ উপমুখ্যমন্ত্রী ডি. কে. শিবকুমার এবং কংগ্রেসের শক্তপোক্ত দুর্গে এই শোচনীয় পরাজয় রাজ্যের দলীয় সংগঠন ও প্রশাসনের জনপ্রিয়তার ওপর এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে।বিশেষ করে এই নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) পরিবর্তে যখন ঐতিহ্যবাহী ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণ করা হয়েছে, তখন বিজেপির এই একপেশে জয় পরোক্ষভাবে বিরোধীদের ইভিএম সংক্রান্ত সমস্ত দাবি ও অভিযোগকে ভোঁতা করে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যালট বা ইভিএম যাই হোক না কেন, স্থানীয় ভোটাররা যে এনডিএ জোটের পক্ষেই জোরালো রায় দিচ্ছেন, এই ফলাফল তারই স্পষ্ট প্রমাণ। যদিও কংগ্রেস নেতৃত্বের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, এই ফলাফল সামগ্রিক রাজ্য সরকারের সার্বিক পারফরম্যান্সের সঠিক চিত্র তুলে ধরে না, তবুও এই ধস কংগ্রেস হাইকমান্ডের জন্য নিশ্চিতভাবেই গভীর উদ্বেগের বিষয়।অন্যদিকে, বিহারের রাজনৈতিক অঙ্গনেও এনডিএ সরকার ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও এমএলসি নির্বাচনের ফল শাসক শিবিরের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। পাটনা শিক্ষক আসনে বিজেপির হেভিওয়েট প্রার্থী তথা দীর্ঘদিনের পোড়খাওয়া নেতা নবল কিশোর যাদব শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। তাঁকে হারিয়ে দুর্দান্ত জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন আরজেডি (RJD) প্রার্থী সঞ্জীব কুমার যাদব। তবে এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক উপহার দিয়েছে প্রশান্ত কিশোরের নবগঠিত দল ‘জন সুরাজ পার্টি’। দলের হেভিওয়েট প্রার্থী সুরেশ প্রসাদ রাই দারভাঙ্গা শিক্ষক আসন থেকে কংগ্রেসের অভিজ্ঞ এমএলসি মদন মোহন ঝাকে পরাজিত করে এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক চমক সৃষ্টি করেছেন। এই ফলাফল স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, বিহারের চিরাচরিত রাজনৈতিক সমীকরণ ভেঙে জন সুরাজ একটি শক্তিশালী বিকল্প শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে, যা আগামী দিনে শাসক ও বিরোধী উভয় শিবিরের জন্যই গভীর চিন্তার কারণ হতে চলেছে। অন্যান্য রাজ্যগুলির সামগ্রিক পরিস্থিতির যদি পর্যালোচনা করা হয়, তবে দেখা যাবে যে উত্তরপ্রদেশের ১১টি এমএলসি আসনের মধ্যে বেশিরভাগ আসনেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। যেখানে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) এবং সমাজবাদী পার্টি (SP) তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে একে অপরকে কড়া টক্কর দিয়েছে। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সংসদীয় এলাকা বারাণসীতে শিক্ষক নির্বাচনী আসনটি হাতছাড়া হয়েছে বিজেপির। পাশাপাশি, মহারাষ্ট্রের বিধান পরিষদ নির্বাচনের ট্রেন্ড অনুযায়ী, রাজ্যের ক্ষমতাসীন মহাযুতি জোট এবং বিরোধী মহা বিকাশ আঘাটা (MVA) জোটের মধ্যে তীব্র ও কণ্টকাকীর্ণ লড়াইয়ের ছবি সামনে এসেছে। সবমিলিয়ে, এই এমএলসি নির্বাচনগুলি স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, রাজ্যস্তরে ক্ষমতায় যেই দল থাকুক না কেন, পেশভিত্তিক ও শিক্ষিত ভোটারদের রায়ে শাসক পক্ষকে বড় ধরনের সতর্কবার্তা পেতে হয়েছে, যা আগামী দিনের মূলধারার জাতীয় রাজনীতিকে সম্পূর্ণ নতুন এক দিশা দেখাবে।