বোরকা পরা গৃহবধূ থেকে রাজস্থানের দাপুটে ট্রাফিক ডিএসপি! অঞ্জু যাদবের অবিশ্বাস্য সাফল্যের লড়াই

রাজস্থানের আজমের জেলার কিশাগড়ে যানবাহন পার্কিং নিয়ে এক আইনজীবীর সঙ্গে বচসা ও তাঁকে চড় মারার ঘটনায় বর্তমানে তুমুল আলোচিত ও সমালোচিত হচ্ছেন ট্রাফিক পুলিশ সুপার (ডিএসপি) অঞ্জু যাদব। এই অনভিপ্রেত ঘটনার জেরে কিশাগড়ের প্রধান বাজারে আইনজীবীরা ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু করেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিনটি থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করতে হয়। এই প্রশাসনিক ও আইনি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা অঞ্জু যাদবের ব্যক্তিগত জীবন ও সংগ্রামের ইতিহাস যে কাউকে অবাক করবে। সামাজিক রীতিনীতি, পর্দার আড়ালে থাকা গ্রামীণ জীবন এবং স্বামীর অকালমৃত্যুর তীব্র মানসিক আঘাত পেরিয়ে এক অদম্য লড়াইয়ের মাধ্যমে তিনি আজ এই অবস্থানে পৌঁছেছেন।
হরিয়ানার নারনৌল অঞ্চলের ধৌলেদা গ্রামের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া অঞ্জু যাদবের শৈশব ছিল চরম সংগ্রামের। চার বোনের মধ্যে সবার বড় হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তাঁকে পারিবারিক দায়িত্বের বোঝা টানতে হয়। গ্রামের সরকারি স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি দূরশিক্ষণের মাধ্যমে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৯ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে রাজস্থানের আলওয়ার জেলার গান্ডালা গ্রামে তাঁর বিয়ে হয়। রক্ষণশীল গ্রামীণ পরিবারে বিয়ের পর তাঁকে বাধ্য হয়ে ঘোমটা বা বোরকার সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকতে হতো। ২০১২ সালে পুত্রসন্তান মুকুলদীপের জন্ম দেওয়ার পর তিনি পারিবারিক দায়িত্বের পাশাপাশি নিজের কেরিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে শ্বশুরবাড়ির প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়ায় ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বার্থে তিনি বাপের বাড়ি ফিরে আসেন। এর মধ্যেই ২০২১ সালে তাঁর স্বামী নিত্যানন্দ গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারা যান। এই চরম ট্র্যাজেডিতে ভেঙে না পড়ে তিনি একক মা (সিঙ্গেল মাদার) হিসেবে নিজের এবং সন্তানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।
স্বাবলম্বী হওয়ার জেদ তাঁকে আবার পড়াশোনার টেবিলে ফিরিয়ে আনে। কঠোর পরিশ্রমের ফলস্বরূপ তিনি পরপর চারটি সরকারি চাকরি লাভ করেন। ২০১৬ সালে মধ্যপ্রদেশের ভিন্দের জওহর নবোদয় বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার পর তিনি প্রায় পাঁচ বছর রাজস্থান ও দিল্লির সরকারি স্কুলেও শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন এবং রাজস্থান পাবলিক সার্ভিস কমিশন (RPSC RAS 2021) পরীক্ষায় অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন। বিধবা বিভাগে ১৭২৫তম র্যাংক অর্জন করে তিনি প্রথম প্রচেষ্টাতেই রাজস্থান পুলিশ সার্ভিসে (RPS) নির্বাচিত হন। রাজস্থান পুলিশ একাডেমিতে কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে ২০২৪ সালের মে মাসে পাসিং আউট প্যারেডের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ (ডিএসপি) পদে অভিষিক্ত হন। কিশাগড়ে ট্রাফিক সিও হিসেবে তাঁর কড়া কর্মনিষ্ঠার জন্য তিনি পরিচিত হলেও, সাম্প্রতিক এই আইনজীবী বিতর্ক তাঁর কেরিয়ারে এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে।