শারদীয় দুর্গোৎসবে মেতে ওঠার পালা! কবে মহালয়া আর কবেই বা বসছে মায়ের আবাহনের ঘট?

শারীরিক ও মানসিক সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজাকে বরণ করে নেওয়ার সময় আর মাত্র কড়া নাড়ছে দরজায়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও আনন্দময় এই শারদীয় দুর্গোৎসব মূলত মা দুর্গার পরম আরাধনার এক বিশেষ ঋতু। এই নয় দিন ধরে ভক্তরা দেবী দুর্গার নয়টি রূপের নৈমিত্তিক পুজো করে থাকেন এবং নিজ নিজ পরিবারে সুখ-সমৃদ্ধি, শান্তি ও অফুরন্ত কল্যাণের প্রার্থনা জানান। শাস্ত্রীয় নিয়ম ও পঞ্জিকা মতে, প্রতি বছর শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রথম দিন অর্থাৎ প্রতিপদ তিথিতে সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ঘটস্থাপনা বা কলশ স্থাপনের মাধ্যমেই এই মহা পবিত্র পর্বের শুভ সূচনা ঘটে। আচার ও বিধি মেনে দেবীর ঘট স্থাপন করলে গৃহকোণে পজিটিভ এনার্জি বা ইতিবাচক শক্তির সঞ্চার হয় এবং দেবীর আশীর্বাদ বর্ষিত হয়।

আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজার মহালয়া এবং নির্ঘণ্ট নিয়ে পঞ্জিকার নতুন তথ্য সামনে এসেছে। এ বছর আগামী ১১ অক্টোবর, অর্থাৎ রবিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে চলেছে শারদীয় দুর্গোৎসব। একই দিনে দেবীপক্ষের সূচনা উপলক্ষে ঐতিহ্য মেনে অত্যন্ত পবিত্র লগ্নে করা হবে ঘটর স্থাপন। পঞ্জিকার গণনা অনুযায়ী, এই দিন অর্থাৎ ১১ অক্টোবর সকাল ৬টা ১৯ মিনিট থেকে সকাল ১০টা ১২ মিনিট পর্যন্ত সময়টি কলশ বা ঘটস্থাপনার জন্য অত্যন্ত শুভ ও ফলদায়ী বলে নির্ধারিত হয়েছে। এছাড়া, ওই দিন বিশেষ অভিজিৎ মুহূর্ত শুরু হবে সকাল ১১টা ৪৪ মিনিটে এবং তা থাকবে দুপুর ১২টা ৩১ মিনিট পর্যন্ত। এই শুভ মুহূর্তগুলির মধ্য দিয়েই মা দুর্গার পূজার্চনা এবং আগামী নয় দিন ধরে চলতে থাকা সমস্ত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও হোম-যজ্ঞের সূচনা ঘটবে।

শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, ঘটস্থাপনার জন্য কিছু উপকরণের বিশেষ প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে রয়েছে একটি মাটির চওড়া মুখের পাত্র, পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ মাটি, যব, পবিত্র কলশ, গঙ্গাজল, শুদ্ধ জল, মুদ্রা বা কয়েন, সুপারি, গোটা চাল বা অক্ষত, দুর্বা, রোমি বা কलावा, আম কিংবা অশোক গাছের পাঁচটি অথবা সাতটি পাতা এবং সম্পূর্ণ জলের একটি নারকেল। এছাড়াও লাল রঙের বস্ত্র বা চুনরী, তাজা ফুল, ফল, পান, এলাচ, লবঙ্গ, বিশুদ্ধ ঘিয়ে জ্বালানো প্রদীপ, বিভিন্ন মিষ্টি এবং বাতাসা পূজায় অত্যন্ত আবশ্যকীয় হিসেবে বিবেচিত হয়।

পূজার প্রথম দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে পরিষ্কার ও নতুন পোশাক পরিধান করতে হবে। এরপর পূজামণ্ডপ বা ঘরের পূজার স্থানটি খুব ভালোভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নিতে হবে। একটি কাঠের চৌকির ওপর পরিষ্কার লাল কাপড় বিছিয়ে সেখানে মা দুর্গার প্রতিমা কিংবা সুন্দর ছবি স্থাপন করতে হবে। এরপর পূজার পুরো স্থানটিতে গঙ্গাজল ছিটিয়ে তার শুদ্ধিকরণ সম্পন্ন করতে হবে। মাকে লাল চুনরী, ফুল এবং বিভিন্ন সাজসজ্জার সামগ্রী ভক্তিভরে অর্পণ করতে হবে। এরপর একটি মাটির পাত্রে পরিষ্কার মাটি নিয়ে তাতে যব ছড়িয়ে দিতে হবে। তার ওপর মাটির একটি হালকা প্রলেপ দিয়ে সামান্য জল ছিটিয়ে দিতে হবে। এরপর পাত্রটি পূজার নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে হবে। দুর্গাপূজার এই পুরো নয় দিন ধরে নিয়ম করে যবে সামান্য জল দিতে হবে, যাতে সহজে অঙ্কুরোদগম হতে পারে।

এরপর পবিত্র কলশে কलावा বা সুরক্ষাসূত্র বেঁধে তাতে গঙ্গাজল ও শুদ্ধ জল পূর্ণ করতে হবে। সেই জলের মধ্যে গোটা সুপারি, মুদ্রা, অক্ষত এবং কাঁচা হলুদ গুঁড়ো বা সুতোর মতো শুভ বস্তু দিতে হবে। কলশের ঠিক মুখে আম বা অশোক গাছের পাতাগুলি সাজিয়ে রেখে তার ওপর নারকেল স্থাপন করতে হবে। এবার সেই পূর্ণ কলশটিকে যব বোনা পাত্রটির পাশে সসম্মানে স্থাপন করতে হবে এবং মা দুর্গার সামনে ঘিয়ে প্রদীপ প্রজ্বলন করতে হবে। ধূপ, ফুল, ফল ও মিষ্টান্ন নিবেদন করে মায়ের মন্ত্রোচ্চারণ ও আরতির মাধ্যমে প্রথম দিনের পূজার সমাপ্তি করতে হবে। ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, যব বা জওয়াককে সমৃদ্ধি ও উর্বরতার প্রতীক বলে মনে করা হয়। তাই দুর্গাপূজায় যব বোনার অর্থ হলো নতুন জীবনের শুভ সূচনা এবং অফুরন্ত সুখ-সমৃদ্ধির বার্তা। যবের সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর অঙ্কুরোদগম হওয়াকে সবসময়ই একটি অত্যন্ত শুভ লক্ষণ বলে গণ্য করা হয়।