আবারও ফিরছে পুরনো আতঙ্ক? নতুন সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে কেন তীব্র সোচ্চার টিআইবি ও আইনি বিশেষজ্ঞরা

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬’-এ নতুন কিছু সংশোধনীর খসড়া প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। সুশীল সমাজ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) এবং আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবিত খসড়াটি হুবহু পাস হলে এটি ডিজিটাল মাধ্যমকে একটি “অবারিত নজরদারি ও জবাবদিহিহীন নিপীড়নমূলক ভুবনে” পরিণত করতে পারে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি এখনও প্রাথমিক আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং সাধারণ নাগরিক বা সাংবাদিকদের হয়রানি প্রতিরোধ করতেই এটি তৈরি করা হচ্ছে।
বিতর্কের মূলে কী কী প্রস্তাবনা?
মন্ত্রিসভায় আলোচনার জন্য পেশ করা খসড়ায় বেশ কিছু বিতর্কিত ধারা যুক্ত করা হয়েছে:
ব্যাপক ক্ষমতার সাইবার কাউন্সিল: প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত কাউন্সিলে পাঁচজন মন্ত্রী ও সরকারি কর্তারা থাকবেন, যা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গুজব ও অপতথ্যে কঠোর সাজা: ‘অযাচাইকৃত’ তথ্য ছড়ানোর অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
আটকের ক্ষমতা: সরকারি সংস্থা যদি মনে করে কোনো কনটেন্ট দেশের অখণ্ডতা, ধর্মীয় সম্প্রীতি ক্ষুণ্ণ করে বা ‘মানহানিকর’, তবে তারা তা অপসারণ বা ব্লক করতে পারবে।
এআই ও কৃত্রিম কনটেন্ট: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা এডিট করে তৈরি করা মানহানিকর ও অশ্লীল উপাদান প্রকাশকে কঠোর অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কেন উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা?
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ডঃ ইফতেখারুজ্জামান কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, “মানহানি, রাষ্ট্রের অবমাননা বা গুজবের মতো সংজ্ঞায় অস্পষ্টতা রেখে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পূর্বের বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো বিরোধী বা ভিন্নমত দমনে এই আইনের অপব্যবহারের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।”
একই সুর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রিয়া আহসান চৌধুরী ও ঢাবি অধ্যাপক ডঃ বি এম মইনুল হোসেনের কণ্ঠে। তাঁদের মতে, জাতিসংঘের নীতি মেনে মিসইনফরমেশন বা অপতথ্যকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে না দেখে সঠিক তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করাই মূল সমাধান হওয়া উচিত।
সরকার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
সমালোচনার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তথ্যমন্ত্রী আন্দালিব রহমান জানিয়েছেন:
সুরক্ষা নিশ্চিত করা: নারী ও তরুণদের অনলাইন বুলিং, সেক্সটর্শন এবং সাইবার প্রতারণা থেকে রক্ষা করতেই সংশোধনী আনা হচ্ছে।
সংবিধান ও বাক-স্বাধীনতা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের গঠনমূলক সমালোচনার অধিকার রয়েছে। তবে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চরিত্রহনন বা গালিগালাজ এবং গঠনমূলক সমালোচনা এক জিনিস নয়।”
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা বজায় রেখেই আইনটির খসড়া চূড়ান্ত করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে সরকার।