সোশ্যালে হঠাৎ কেন ঝড় তুলল সত্যজিতের ‘মহাপুরুষ’? জানেন এই আইকনিক চরিত্রের আসল ইতিহাস?

বাঙালি সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্ধবিশ্বাস এবং ভণ্ড সাধুদের মুখোশ উন্মোচনে পরশুরাম (রাজশেখর বসু) ও সত্যজিৎ রায়ের যুগলবন্দি যে কতটা নির্মম ও তীক্ষ্ণ ছিল, তার অন্যতম সেরা দলিল ১৯৬৫ সালের ছবি ‘মহাপুরুষ’। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় সত্যজিতের সেই কালজয়ী ছবির ‘বিরিঞ্চিবাবা’র একটি দৃশ্য নতুন করে ভাইরাল হয়েছে, যা ফের একবার মনে করিয়ে দিয়েছে নস্টালজিক সেই মুহূর্তগুলিকে।

১৯৫৮ সালে ‘পরশ পাথর’-এর সাফল্যের পর রাজশেখর বসুর ‘বিরিঞ্চিবাবা’ গল্প অবলম্বনে এই ছবি নির্মাণ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। ছবিতে বিরিঞ্চিবাবার চরিত্রে অভিনেতা চারুপ্রকাশ ঘোষের অসাধারণ অভিনয় আজও বাঙালি সিনেপ্রেমীদের মনে শিহরণ জাগায়। ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে ভক্তদের উদ্দেশে সন্দেশ ছুঁড়ে দেওয়া, স্টেশন মাস্টার থেকে ড্রাইভারের ভক্তিরসে আপ্লুত হওয়া কিংবা চলন্ত ট্রেনের দরজা থেকে সাধুর বুড়ো আঙুল স্পর্শ করার সেই দৃশ্য আজও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক শানিত চাবুক। জানলা দিয়ে সূর্যকে ‘ঘুম থেকে তোলার’ দৃশ্যটি শুধুই কৌতুক নয়, বরং বিজ্ঞানের যুগেও মানুষের অহেতুক অলৌকিকতার প্রতি অন্ধ দাসত্বকে তীব্রভাবে ফুটিয়ে তোলে।

কে এই চারুপ্রকাশ ঘোষ? শান্ত অথচ গম্ভীর চোখ আর নিখুঁত বাচিক অভিনয়ে যিনি বিরিঞ্চিবাবাকে চিরস্মরণীয় করে তুলেছিলেন, তিনি পেশায় ছিলেন একজন সাধারণ সরকারি কর্মচারী এবং জন্মসূত্রে কলকাতারই মানুষ (১৯১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর)। তবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত এক নাম। ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’ (IPTA)-এর উপদেষ্টা কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের সঙ্গে তিনি গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। সত্যজিৎ রায় তাঁর জহুরি চোখ দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে বিরিঞ্চিবাবাকে কোনওভাবেই সস্তা বা ভাঁড় হিসেবে দেখানো যাবে না। চারুপ্রকাশ ঘোষের গম্ভীর কণ্ঠস্বর, অনন্য বাচিক অভিনয় এবং মুখের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি চরিত্রটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।

‘মহাপুরুষ’ ছাড়াও ‘অভিযান’ (১৯৬২) ছবির ধূর্ত ব্যবসায়ী ‘সুখনরাম’, ‘অপরাজিত’ (১৯৫৬)-এ অপুর বেনারস জীবনের ‘নন্দ’, কিংবা সত্যজিতের চিত্রনাট্যে তৈরি ‘বাক্স বদল’ (১৯৭০)-এর ‘মামা’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও প্রশংসিত। পরবর্তীতে মৃণাল সেনের কান চলচ্চিত্র উৎসব জয়ী ছবি ‘খারিজ’ (১৯৮২)-এ একজন আইনজীবীর ছোট চরিত্রেও তিনি নজর কেড়েছিলেন। তবে ‘মহাপুরুষ’-এর বিরিঞ্চিবাবাই তাঁর অভিনয় জীবনের শ্রেষ্ঠ সিগনেচার পারফরম্যান্স হিসেবে চিরকালের মতো অমর হয়ে রয়েছে।