ইতিহাসের দোরগোড়ায় ভারতীয় রেল! আগামী বছরই পরীক্ষামূলক রান, জানুন রুট ও ভাড়ার যাবতীয় তথ্য

ভারতীয় রেলের ইতিহাসে এক নতুন ও সোনালী অধ্যায় যুক্ত হতে চলেছে। দ্রুতগতির ট্রেনে ভ্রমণের জন্য দেশের নাগরিকদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবশেষে অবসান ঘটতে চলেছে। দেশের সবচেয়ে মেগা এবং আলোচিত প্রকল্প, অর্থাৎ মুম্বাই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্পটি তার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে সফলভাবে পৌঁছে গেছে। কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব সোমবার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণায় জানিয়েছেন যে, এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের নির্মাণ কাজ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। সবথেকে বড় এবং রোমাঞ্চকর খবর হলো, দেশের প্রথম পরীক্ষামূলক বুলেট ট্রেনের কোচটি এখন সম্পূর্ণ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালের মে মাসেই দেশের রেলপথে বুলেট ট্রেনের ঐতিহাসিক ট্রায়াল রান বা পরীক্ষামূলক যাত্রা শুরু হতে চলেছে।

বুলেট ট্রেনের আধুনিক পরিকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে ভারত কেবল বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে বসে নেই। দেশের নিজস্ব ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের হাত ধরে এখন দেশীয় প্রযুক্তিতেও দ্রুতগতির ট্রেন তৈরি করা হচ্ছে। রেলমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, জাপানে বুলেট ট্রেনের কোচ তৈরির পাশাপাশি এর এক্সক্লুসিভ ভারতীয় সংস্করণও সমান্তরালভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে। ভারত তার প্রথম নিজস্ব দেশীয় দ্রুতগতির ট্রেন তৈরি করছে, যার সাংকেতিক বা কোড নাম রাখা হয়েছে ‘বি-২৮’। চেন্নাই-ভিত্তিক মর্যাদাপূর্ণ ইন্টিগ্রাল কোচ ফ্যাক্টরি বা আইসিএফ এই ট্রেন তৈরির গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি বিইএমএল লিমিটেডকে প্রদান করেছে। ট্রেনটিকে আরও উন্নত করতে এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধনের জন্য সেটিকে পরবর্তী পরীক্ষার স্তরে পাঠানো হয়েছে। এর ফলে, ভারতে উচ্চগতির ট্রেন উৎপাদনের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।

বর্তমান সময়ে মুম্বাই ও আহমেদাবাদের মধ্যে ৫০৮ কিলোমিটারের এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে সাধারণ ট্রেন বা বাসে প্রায় ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। কিন্তু বুলেট ট্রেন চালু হলে এই যাতায়াতের সময় নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ২ ঘণ্টায় নেমে আসবে। এই অত্যাধুনিক ট্রেনটি ঘণ্টায় ২৫০ থেকে ২৮০ কিলোমিটার গতিবেগে ছুটবে। তবে ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা সম্পূর্ণ মাথায় রেখে, ট্র্যাকটিকে ভবিষ্যতে ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটারের ডিজাইন স্পিডের উপযোগী করে প্রস্তুত করা হচ্ছে। রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রাথমিকভাবে সুরাট থেকে বিলিমোরা সেকশনে বুলেট ট্রেন চলাচল শুরু হবে। এছাড়া ভাপি-সুরাট সেকশনের সিভিল নির্মাণ কাজ আগামী ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই পুরোপুরি শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে, ২০২৭ সালের আগস্ট মাসের মধ্যেই সম্পূর্ণ করিডোরে জনসাধারণের জন্য এই হাই-স্পিড রেল পরিষেবা চালু হবে বলে প্রবল আশা করা হচ্ছে।

এই উচ্চগতির রেল করিডোরটি মহারাষ্ট্র, গুজরাট এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল দাদরা ও নগর হাভেলির বিভিন্ন এলাকার ওপর দিয়ে যাবে। পুরো রুটে মোট ১২টি বিশ্বমানের আধুনিক স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে মুম্বাইয়ের বান্দ্রা কুরলা কমপ্লেক্স বা বিকেসি স্টেশনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষণীয়, কারণ এখানেই দেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ বুলেট ট্রেন স্টেশনটি তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ট্রেনটি থানে, ভিরার, বোইসার, ভাপি, বিলিমোরা, সুরাট, ভারুচ, ভাদোদরা, আনন্দ, নদিয়াদ হয়ে আহমেদাবাদের সবরমতি পর্যন্ত যাবে। প্রতিটি স্টেশনকে সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ডিজাইন করা হচ্ছে। যাত্রীরা এই সমস্ত স্টেশনে বিমান বন্দরের মতো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং চমৎকার মাল্টিমোডাল সংযোগের সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন। ভারতের প্রথম উচ্চ-গতির রেল নেটওয়ার্ক চালুর এই মেগা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে। অশ্বিনী বৈষ্ণবের সাম্প্রতিক পর্যালোচনা সভা থেকে স্পষ্ট যে, নির্মাণকাজ এখন তার চূড়ান্ত সাফল্যের দিকে এগিয়ে চলেছে।