দেহের খোঁজ নেই তো কী হয়েছে! নেপালে হড়পা বানের ৯ দিন পর নিখোঁজ স্বজনদের যেভাবে শেষ বিদায় জানাচ্ছে পরিবার

প্রিয়জনের মৃত্যু হলে ধর্মীয় উপাচার মেনে শেষকৃত্য সম্পন্ন করে তাঁদের চিরবিদায় জানানোই সমাজের চিরাচরিত নিয়ম। কিন্তু যে স্বজনের মৃতদেহটাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তাঁর শেষকৃত্য কীভাবে হবে? শতকের পর শতক ধরে চলা নেপালের নুয়াকোটের এক প্রাচীন রীতি অনুযায়ী, পরিবারের কেউ সাত দিন বা তার বেশি নিখোঁজ থাকলে তাঁর প্রতীকী সৎকার করার প্রচলন রয়েছে। আর ভয়াবহ হড়পা বান বিপর্যয়ের পর বর্তমানে ঠিক এই পথেই হাঁটছেন দুর্গত পরিবারের সদস্যরা।

ভয়াবহ বিপর্যয় ও প্রতীকী শেষকৃত্য: নেপালে ভয়ংকর হড়পা বান ও বিপর্যয়ের পর ইতিমধ্যে ৯ দিন কেটে গিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে খবর, শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ১,২৫৯ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং এখনও পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এই বিশাল সংখ্যক নিখোঁজদের মধ্যে যাঁদের আর জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা নেই, বাধ্য হয়ে তাঁদের প্রতীকী সৎকার শুরু করেছেন স্বজনরা।

রসুয়া এলাকার বাসিন্দা কমলেশ সিং তামাংয়ের জীবনে নেমে এসেছে এক গভীর ট্রাজেডি। হড়পা বানের পর থেকে তাঁর পরিবারের ১৭ জন সদস্যের এখনও কোনো খোঁজ মেলেনি। ভাই, বোন, ছেলে, মেয়ে থেকে শুরু করে ভাইপো-ভাইজি—১১ থেকে ৪৫ বছর বয়সি এই ১৭ জনই নিখোঁজ। টানা ৯ দিন ধরে চারপাশ তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোনো হদিশ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁরা আর বেঁচে নেই বলেই ধরে নিয়েছেন কমলেশ।

পছন্দের খাবার ও কুশপুতুল দাহ: পরিবারের নিখোঁজ ১৭ জন সদস্যকে স্মরণ করে মঠে কুশপুতুল তৈরি করা হয়। সাদা চাদর দিয়ে সেই পুতুলগুলি ঢেকে তারপর তাতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। কুশপুতুল দাহ করার সময় সেই আগুনে নিহতের প্রিয় পানীয় জল, ঠান্ডা পানীয়, চিপস এবং বিস্কুট অর্পণ করা হয়। কমলেশের কথায়, পরিবারের এই ১৭ জন সদস্যই এই ধরনের খাবার অত্যন্ত পছন্দ করতেন। কিন্তু সব ভালোলাগা পেছনে ফেলে তাঁদের অচেনা দুনিয়ায় পাড়ি দিতে হয়েছে, তাই শেষবারের মতো তাদের জন্য এই আয়োজন। প্রাচীন মিশরের মমির সাথে খাবার বা প্রয়োজনীয় জিনিস রাখার কথা শোনা গেলেও, আধুনিক যুগে প্রিয়জনদের অন্ত্যেষ্টিতে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য সত্যি নজিরবিহীন।

দিনরাত এক করে প্রিয়জনদের খোঁজার পর অবশেষে বুকফাটা কান্না ও ভারী মন নিয়ে মঠের মাটিতে প্রতীকী সৎকার সম্পন্ন করতে দেখা যাচ্ছে অজস্র মানুষকে। নেপালের এই মর্মান্তিক ছবি এখন গোটা বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।