জিডিপি বৃদ্ধিতে কি সত্যিই চাঙ্গা দেশের অর্থনীতি? চোখ রাঙাচ্ছে কোন লুকোনো বিপদ?

দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির মাপকাঠিতে জিডিপি (GDP) বা স্থূল অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির হার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক সূচক। যখন কোনো দেশের জিডিপি দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পায়, তখন তা সরাসরি এই ইঙ্গিত দেয় যে সামগ্রিকভাবে সেই দেশের অর্থনীতি অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড ও অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই ক্রমবর্ধমান অগ্রগতির পাশাপাশি দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যতে লুকিয়ে থাকা নানা সম্ভাব্য ঝুঁকি ও আশঙ্কার দিকগুলির প্রতিও তীব্র সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। এমতাবস্থায় সবচেয়ে বড় এবং তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ঊর্ধ্বমুখী জিডিপি বৃদ্ধির প্রকৃত তাৎপর্য ঠিক কী এবং এর জেরে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থাৎ রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার (RBI) নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে কী ধরনের কঠিন চ্যালেঞ্জ ও জটিল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

সাধারণভাবে উচ্চ জিডিপি বৃদ্ধির অর্থ হলো দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়া, কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হওয়া এবং মানুষের মাথাপিছু আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়া। এর ফলে সামগ্রিক বাজার চাঙ্গা থাকে এবং বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হন। কিন্তু এর উল্টো পিঠে বেশ কিছু অন্তর্নিহিত ঝুঁকিও সমানভাবে সক্রিয় থাকে। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি, কাঁচামালের দামের চরম ওঠানামা এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মতো বিষয়গুলি অর্থনীতির ধারাবাহিক গতিশীলতাকে বড় ধাক্কা দিতে পারে। যখন বাজারে অর্থের জোগান ও চাহিদা হঠাৎ করে অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়ে যায়, তখন মুদ্রাস্ফীতির পারদ চড়ার একটা তীব্র সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের পকেটে টান ফেলতে পারে।

এই জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সামনে এখন অত্যন্ত কঠিন ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে অর্থনীতির এই রথযাত্রাকে সচল রাখতে সুদের হার যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে রাখা প্রয়োজন, অন্যদিকে লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি বা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব। ব্যাংকগুলিকে সুদের হারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত হিসেবি পদক্ষেপ নিতে হয় যাতে একদিকে সাধারণ মানুষের ঋণের বোঝা অতিরিক্ত না বাড়ে এবং অন্যদিকে বাজার স্থিতিশীল থাকে। সুতরাং, কেবল উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধির খতিয়ান দেখে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো অবকাশ নেই; বরং আগামীর অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নীতিনির্ধারক মহলকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলতে হবে।