চোখের জলে ভাসতে ভাসতে পরীক্ষা! নেপালের ভয়াবহ প্রলয়ে বাবা-মাকে হারিয়েও কীভাবে ইতিহাস গড়লেন এই মেধাবী ছাত্রী?

হিমালয়কন্যা নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের প্রাকৃতিক বিপর্যয় হাজার হাজার পরিবারকে এক চরম ও মর্মান্তিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। চলতি বছরের ২৬ আগস্ট সংঘটিত এই প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন ৯০০-রও বেশি মানুষ, আর এখনও পর্যন্ত ৩,০০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এই নিদারুণ নিখোঁজদের তালিকাতেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন ২৪ বছর বয়সী উদীয়মান মেধাবী মেডিকেল শিক্ষার্থী তনভীর মা-বাবা, যাঁরা পুণ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে কৈলাশ মানস সরোবর যাত্রায় নেপালে গিয়েছিলেন। মাথার ওপর থেকে বাবা-মায়ের সুরক্ষাবলয় হারিয়ে যাওয়ার পরেও এবং কোনো খোঁজ না পাওয়ার গভীর শোকে নিমজ্জিত থেকেও তনভী এক অসম্ভব দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে NEET PG 2026 পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। জীবনের এই সবচেয়ে কালো ও বেদনাবিধুর অধ্যায়ে পরীক্ষা চলাকালীন তিনি টানা দেড় ঘণ্টা ধরে ডুকরে কেঁদেছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রয়াত বা নিখোঁজ বাবার সুপ্ত ইচ্ছের কথা স্মরণ করে তিনি অসাধ্য সাধন করে সম্পূর্ণ পেপারটি শেষ করেন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা শেয়ার করে তনভী জানান যে, পরীক্ষার হলে যখন তিনি বসেছিলেন, তখন শোক ও আতঙ্কে তাঁর হাত থরথর করে কাঁপছিল এবং চোখ দিয়ে অবিরাম জল গড়াচ্ছিল। প্রবল কান্নার বেগে কম্পিউটারের ডিজিটাল স্ক্রিনের ওপরে ভেসে থাকা প্রশ্নগুলো পড়া তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তা সত্ত্বেও তিনি চরম মানসিক সংযম বজায় রেখে পরীক্ষা চালিয়ে যান। তনভীর কথায়, পরীক্ষার প্রতিটা মুহূর্তে তাঁর মনে কেবল বাবার কথাই ভেসে উঠছিল। তিনি জানান, তাঁর পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ডে যে ছবি প্রিন্ট করা ছিল, তা খোদ তাঁর বাবাই ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। এই ছোট ছোট স্মৃতিগুলো পরীক্ষার হলে তাঁর বুকের ভেতর হাহাকার আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রায় তিন ঘণ্টার দীর্ঘ সেই পরীক্ষার পুরোটা সময় জুড়ে তিনি প্রায় দেড় ঘণ্টাই শুধু কেঁদে কাটিয়েছেন।

তনভী জানান, তাঁর মা অনঘা আন্নামদেভরা এবং বাবা ভেঙ্কটরাম আন্নামদেভরা মোট ৬৭ জন তীর্থযাত্রীর একটি বড় দলের সঙ্গে কৈলাশ যাত্রায় পাড়ি দিয়েছিলেন। নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস আছড়ে পড়ার পর থেকেই তাঁর পরিবারের ওই নির্দিষ্ট যাত্রাদল এবং সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ওই দলটি নেপালের ইমিগ্রেশন সেন্টার এবং মৈত্রী সেতু সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার কারণে এখনও পর্যন্ত কোনো নিশ্চিত খবর পাওয়া সম্ভব হয়নি। তনভী দেশবাসীর কাছে তাঁর বাবা-মায়ের সুস্থ শরীরের ফিরে আসার জন্য প্রার্থনা করার আর্জি জানিয়েছেন। তিনি দৃঢ় আশাবাদী যে তাঁর বাবা-মা অক্ষত শরীরে ফিরে আসবেন। তিনি স্পষ্ট জানান যে তাঁর বাবা সবসময় চাইতেন তিনি যেন যেকোনো মূল্যে NEET PG পরীক্ষায় বসেন, তাই বাবার সেই স্বপ্নকে সম্মান জানিয়েই তিনি এই কঠিন লড়াই লড়েছেন।

এমডি (MD) এবং এমএস (MS)-সহ দেশের সমস্ত নামী প্রতিষ্ঠানে স্নাতকোত্তর মেডিকেল কোর্সে নামকরণের জন্য আয়োজিত NEET PG 2026 পরীক্ষাটি দেশজুড়ে এক বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সারা দেশের মোট ১,১১১টি নির্ধারিত কেন্দ্রে অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সিঙ্গেল শিফটে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আড়াই লক্ষেরও বেশি অর্থাৎ প্রায় ২.৬৩ লক্ষ পরীক্ষার্থী তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াইয়ে অংশ নেন। পরীক্ষাটি সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২:৩০ মিনিট পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে। তবে রাজস্থানের জয়পুরের সীতাপুরা এলাকার দুটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে আকস্মিক ও যান্ত্রিক গোলযোগ বা প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করা হয়। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ওই কেন্দ্রগুলির পরীক্ষার্থীদের জন্য আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে পুনরায় পরীক্ষার আয়োজন করা হবে।