হরমুজ সংকটের মাঝে মোদির মাস্টারস্ট্রোক! ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এই ঐতিহাসিক বৈঠকেই কি বদলাবে বিশ্বরাজনীতি?

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকা-ইরান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়ার পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই জটিল আবহে কিরঘিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO) শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে আঞ্চলিক সংঘাত শুরুর পর এটিই দুই নেতার প্রথম মুখোমুখি বৈঠক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক, মানবিক এবং কৌশলগত দিক থেকে এই বৈঠকের গুরুত্ব অপরিসীম। মূলত চারটি প্রধান কারণে এই আলোচনা আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে:
১. জ্বালানি সরবরাহ সুরক্ষিত রাখা ও মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ:
পশ্চিম এশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে ভারত মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। হরমুজ প্রণালী বিশ্বব্যাপী তেল পরিবহণের প্রধান প্রবেশপথ হওয়ায় এর অবরোধ ভারতের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯০ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করলে দেশের মূল্যবৃদ্ধির হার হু হু করে বাড়তে পারে। তাই জ্বালানি ও পণ্যের পরিবহণ যাতে নির্বিঘ্ন থাকে, তা নিশ্চিত করাই ছিল এই বৈঠকের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
২. আটকে পড়া ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা:
সংঘাতপূর্ণ এলাকায় আটকে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের শারীরিক নিরাপত্তা রক্ষা করা এই মুহূর্তে নয়াদিল্লির কাছে অন্যতম বড় মানবিক অগ্রাধিকার। বর্তমানে অস্থির হরমুজ প্রণালীতে প্রায় ৮০০ ভারতীয় নাবিককে নিয়ে ২৮টি জাহাজ আটকে রয়েছে। তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলির অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করার জন্য তেহরানের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ একান্ত জরুরি ছিল।
3. বিকল্প বাণিজ্যিক করিডর (INSTC) সচল রাখা:
মার্কিন-ইরান যুদ্ধ ও লোহিত সাগরে লাগাতার উত্তেজনার ফলে প্রচলিত সমুদ্রপথগুলি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বিকল্প পথের সন্ধান করছে দেশগুলি। ৭,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর (INSTC) এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই বৈঠক বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। এই নেটওয়ার্ক ইরানের মধ্য দিয়ে মুম্বইকে সেন্ট পিটার্সবার্গের সঙ্গে যুক্ত করে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জলপথগুলি এড়িয়ে চলার সুবর্ণ সুযোগ করে দেয়।
৪. ভারতের নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি:
আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রেখেও নয়াদিল্লি যে ইরানের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক সুচারুভাবে রক্ষা করে চলেছে, এই বৈঠক তারই প্রমাণ। সামরিক সংঘাতের পরিবেশ এড়িয়ে কূটনীতি ও আলোচনার পক্ষে সওয়াল করার ক্ষেত্রে ভারতের এই অবস্থান বিশ্বমঞ্চে দেশকে আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।