মশা তাড়াতে ঘরে কয়েল বা স্প্রে ব্যবহার করছেন? অজান্তেই কোন ভয়ংকর মৃত্যুর পরোয়ানা টানছেন?

সন্ধ্যা নামলেই ঘরবন্দি হয়ে কয়েল জ্বালানো কিংবা কড়া গন্ধযুক্ত রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহার করা আমাদের দেশের প্রতিটি ঘরের চিরপরিচিত দৃশ্য। মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা পেতে এবং ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া বা চিকুনগুনিয়ার মতো ভয়ঙ্কর রোগের হাত থেকে বাঁচতে আমরা অনেকেই এই কৃত্রিম উপায়গুলোর ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা রাখি। কিন্তু আপনি কি কখনো গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন, যে ধোঁয়া বা রাসায়নিক ফোঁটা নিমেষে মশা সাফ করে দিচ্ছে, তা কতটা নীরবে এবং অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে আপনার ও আপনার পরিবারের ফুসফুসকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দিচ্ছে? স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণা প্রকাশ করেছে যে, এই আপাতনিরীহ মশা তাড়ানোর মাধ্যমগুলো আসলে আমাদের শরীরে দীর্ঘমেয়াদী এবং মারাত্মক মারণ রোগের বীজ বপন করছে।
বাজারচলতি অধিকাংশ মশার কয়েল, লিকুইড ভেপোরাইজার এবং অ্যারোসল স্প্রে-তে পাইরেথ্রয়েড, কার্বামেট এবং অর্গানোফসফেটের মতো তীব্র এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক সিন্থেটিক রাসায়নিক উপাদান ব্যবহৃত হয়। যখন একটি কয়েল একটানা কয়েক ঘণ্টা ঘরে জ্বলতে থাকে, তখন তা থেকে যে ধোঁয়া নির্গত হয়, তাতে প্রায় ১০০টি সিগারেট পোড়ানোর সমান বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড এবং ফর্মালডিহাইডের মতো কার্সিনোজেনিক উপাদান থাকে। এই বিষাক্ত ধোঁয়া বা রাসায়নিক কণাগুলো যখন নিয়মিত আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে, তখন তা রেসপিরেটরি সিস্টেম বা শ্বাসতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই হাঁপানি, ব্রংকাইটিস বা সিওপিডি (COPD)-র মতো দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ধোঁয়া প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে এই কৃত্রিম রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকলে শুধুমাত্র ফুসফুসের ক্যানসার বা মারাত্মক অ্যাটাকই নয়, বরং স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি, অ্যালার্জি, দীর্ঘমেয়াদী মাথাব্যথা এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতার মতো জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুদের কোমল শরীরে এর প্রভাব আরও বেশি দ্রুত এবং ক্ষতিকর হিসেবে প্রকাশ পায়, যা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়।
তাহলে কি মশার কামড় থেকে বাঁচতে কোনো উপায় নেই? অবশ্যই আছে। রাসায়নিক কয়েল বা স্প্রের বদলে প্রাকৃতিকভাবে মশা তাড়ানোর নিরাপদ উপায় বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। ঘরের জানলা ও দরজায় মশারি বা ফাইন নেট ব্যবহার করা, নিম তেল ও কর্পূরের মিশ্রণ জ্বালানো, কিংবা ইউক্যালিপটাস ও লেমন গ্রাসের মতো এসেনশিয়াল অয়েল ব্যবহার করা অত্যন্ত কার্যকরী। এ ছাড়া তুলসী, লেমন গ্রাস বা গন্ধরাজ গোলার মতো গাছ ঘরে রাখলে প্রাকৃতিকভাবেই মশা দূরে থাকে। একটুখানি সচেতনতা এবং সামান্য পরিবর্তনই পারে আপনার এবং আপনার প্রিয়জনদের এই নীরব মারণ ফাঁদের হাত থেকে নিশ্চিতভাবে রক্ষা করতে।