পুনা চুক্তির পেছনের ভয়ংকর সত্যি! আম্বেসকর ও গান্ধীর ঐতিহাসিক সংঘাত কেন আজও শিহরিত করে?

ভারতীয় ইতিহাসে ১৯৩০-এর দশক ছিল গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার এক ক্রান্তিলিকাল। সমাজের সবচেয়ে নিপীড়িত অংশ—দলিত বা অস্পৃশ্যদের অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে তখন শুরু হয়েছিল এক যুগান্তকারী আদর্শগত লড়াই। এই ঐতিহাসিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দুই ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব—মহাত্মা গান্ধী এবং ডঃ ভীমরাও আম্বেদকর। এই আদর্শগত সংঘাতের সবচেয়ে নাটকীয় ও চরম মুহূর্তটি আসে ১৯৩২ সালের সেপ্টেম্বরে, যখন মহাত্মা গান্ধী পুনের ইয়েরওয়াড়া জেলে আমরণ অনশন শুরু করেন। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা এবং তার ফলস্বরূপ স্বাক্ষরিত পুনা চুক্তি ভারতের ভবিষ্যৎ নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং সামাজিক সংরক্ষণের কাঠামোর ভিত্তি স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছিল।

১৯৩২ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রামসে ম্যাকডোনাল্ড ঘোষণা করেন কুখ্যাত ‘সাম্প্রদায়িক পুরস্কার’। এর অধীনে ব্রিটিশ সরকার ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পাশাপাশি দলিতদের একটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী প্রতিষ্ঠা করে। এর অর্থ ছিল, দলিত-সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনগুলিতে কেবল দলিত প্রার্থীরাই লড়তে পারবেন এবং কেবল দলিত ভোটাররাই তাঁদের ভোট দিতে পারবেন। ডঃ বি. আর. আম্বেদকর এই সিদ্ধান্তকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছিলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিপীড়ন থেকে দলিতদের রাজনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করার এটিই ছিল একমাত্র কার্যকর পথ। তবে মহাত্মা গান্ধী এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে যুক্তি দেন যে অস্পৃশ্যরা হিন্দু সমাজ থেকে আলাদা নয় এবং পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী হিন্দু সমাজকে স্থায়ীভাবে টুকরো টুকরো করে দেবে। ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত না বদলালে তিনি ১৯৩২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ইয়েরওয়াড়া জেলে আমরণ অনশনে বসেন।

গান্ধীজির এই অনশন সারা দেশে চরম আতঙ্ক ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে। তাঁর স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটায় সমস্ত রাজনৈতিক চাপ এসে পড়ে ডঃ আম্বেদকরের ওপর। মদন মোহন মালবীয় এবং সি. রাজাগোপালাচারীর মতো বিশিষ্ট নেতারা গান্ধীর জীবন বাঁচাতে আম্বেদকরের কাছে মধ্যপন্থা খোঁজার আবেদন জানান। আম্বেদকর এক চরম উভয়সঙ্কটে পড়েন, কারণ গান্ধীর কিছু হলে দেশে দলিতদের ওপর ভয়ংকর সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। অবশেষে তীব্র চাপ ও অন্তহীন আলোচনার পর ১৯৩২ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর ইয়েরওয়াড়া জেলে ঐতিহাসিক ‘পুনা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির ফলে পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী বাতিল করা হয় এবং তার বদলে প্রাদেশিক আইনসভায় দলিতদের সংরক্ষিত আসন ৭১ থেকে বাড়িয়ে ১৪৮ করা হয়, যেখানে যৌথ ভোটাধিকারের মাধ্যমে সব বর্ণের মানুষ ভোট দেওয়ার অধিকার পান।