২ কোটি টাকার উৎস কোথায়? ক্যামাক স্ট্রিট ও কালীঘাট নিয়ে সরাসরি বিস্ফোরক দাবি শুভেন্দুর

নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে ঐতিহাসিক ও বিপুল ব্যবধানে জয়লাভের পর অবশেষে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় বিধায়ক হিসেবে শপথ নিলেন হাসিরানি রথ। তাঁর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বুধবার বিধানসভা চত্বরে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক উন্মাদনা তৈরি হয়। এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। হাসিরানি রথকে বিধানসভায় স্বাগত জানিয়ে এবং তাঁকে বিশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, হাসিরানি দেবীর ওপর যে নির্মম ও মর্মান্তিক আঘাত নেমে এসেছে, তার সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে সরকার এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সম্পূর্ণভাবে বদ্ধপরিকর।
উল্লেখ্য, হাসিরানি রথের পুত্র চন্দ্রনাথ রথ ছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে তাঁকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে খুন করা হয়। এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তদন্তভার হাতে নেওয়ার পর থেকেই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানান, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে সিবিআই ইতিমধ্যে সাতজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। ধৃতদের মধ্যে কুখ্যাত শ্যুটার এবং সুপারি কিলাররাও রয়েছে। তবে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা মূল আর্থিক লেনদেন তথা ঠিক ২ কোটি টাকার বরাত কোথা থেকে এবং কার মাধ্যমে এসেছিল, তা এখনও পর্যন্ত পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এই প্রসঙ্গেই শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে ক্যামাক স্ট্রিট, কালীঘাট এবং ডায়মন্ড হারবারের যোগসূত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ সৃষ্টি করেছেন।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আরও বলেন, “হাসিরানি মহাশয়ার তরুণ এবং মেধাবী পুত্র ভারতীয় বায়ুসেনায় অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন এবং দেশের সেবা করেছেন। তাঁকে যেভাবে পরিকল্পিতভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তার তীব্র যন্ত্রণা হাসিরানি দেবীর রয়েছে। আমি সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী যে তিনি ন্যায়বিচার পাবেন। সিবিআই তদন্ত ইতিমধ্যেই অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে অগ্রসর হয়েছে। সাতজন অপরাধী আইনের জালে ধরা পড়েছে। এখন শুধু একটিমাত্র বিষয় স্পষ্ট হওয়া বাকি—এই ২ কোটি টাকার উৎস কোথায়? সেই টাকা কি ক্যামাক স্ট্রিট থেকে এসেছিল, নাকি কালীঘাট থেকে এসেছিল, কিংবা ডায়মন্ড হারবারের কেউ সেই অর্থের জোগান দিয়েছিল? এই একটিমাত্র সূত্র উন্মোচিত হলেই তদন্তের বৃত্ত সম্পূর্ণ হবে এবং আসল ষড়যন্ত্রকারীরা প্রকাশ্যে আসবে।”
প্রসঙ্গত, অতীতে শুভেন্দুর ছেড়ে যাওয়া নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রেই উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই আসনে প্রয়াত চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানি রথকে প্রার্থী করা হয়েছিল। জনসমর্থনের জোয়ারে ভেসে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে প্রথমবার বিধানসভায় প্রবেশ করলেন। এই বিশাল জয়ের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব নন্দীগ্রামের আপামর জনসাধারণকে উৎসর্গ করে শুভেন্দু তাঁদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এদিন তিনি আরও একবার ব্যাখ্যা করেন কেন তিনি অতীতে ভবানীপুর আসনটি রেখে নন্দীগ্রাম ছেড়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নন্দীগ্রামের সংগ্রামী জনগণ আমার ওপর কিছুটা অভিমান করে বলেছিলেন যে আমি কেন ভবানীপুর আসনটি ছাড়লাম। আমি তাঁদের পরিষ্কার বুঝিয়ে বলেছি যে, ভবানীপুর আসনটি ধরে রাখলে যিনি আমার কাছে অতীতে দু’বার বিপুল ভোটে পরাজিত হয়েছেন, তিনি পুনরায় রাজনৈতিক লড়াইয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়ে যেতেন। সেই সুযোগ প্রতিপক্ষকে দেওয়া কোনোভাবেই সমীচীন হতো না। এছাড়া বয়সের কথা মাথায় রেখেও এই বয়সে আর সক্রিয় রাজনীতিতে না দাঁড়ানোই শ্রেয়। ওঁর বয়স প্রায় পঁচাত্তরের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এই বয়সে রাজনৈতিক দৌড়ঝাঁপ বাদ দিয়ে মানুষের বিশ্রাম নেওয়ার সময়। সেই সমস্ত দিক বিচার করেই আমি নন্দীগ্রামের আসনটি ছেড়েছিলাম।”
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে নন্দীগ্রামের মানুষের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দৃঢ় আশ্বস্ত করে বলেন, হাসিরানি রথের মাধ্যমেই নন্দীগ্রামের উন্নয়নের জন্য ইতিপূর্বে সাধারণ মানুষের কাছে দেওয়া সমস্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে রক্ষা করা হবে। বিধানসভায় হাসিরানি দেবীর প্রবেশ এবং মুখ্যমন্ত্রীর এই তীব্র আক্রমণাত্মক ও জনমুখী বক্তব্য আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে যে নতুন মোড় দেবে, তা বলাই বাহুল্য।