রাজা নেই, রাজপাটও অতীত—তবু শত শত বছর ধরে কীভাবে টিকে রয়েছে বাঁকুড়ার এই বিখ্যাত বনেদি বাড়ির দুর্গোৎসব?

মোঘল আমলের ঐতিহ্য আর রাজকীয় আভিজাত্য! শত শত বছরের ইতিহাস বহন করছে বাঁকুড়ার মালিয়াড়া রাজবাড়ির পুজো

আধুনিক থিম আর আলোর রোশনাইয়ে যখন রাজ্যের প্রতিটি কোণ সেজে ওঠে, তখন অন্যদিকে সময়ের নিয়মে রূপ বদলেছে প্রাচীন বনেদি বাড়িগুলোর। তবে জৌলুস কমলেও আজও নিজের পুরোনো ঐতিহ্য ও আভিজাত্যকে ধরে রেখেছে বাঁকুড়ার ঐতিহাসিক মালিয়াড়া রাজবাড়ির দুর্গাপুজো। শত শত বছরের পুরনো এই পুজোর প্রতিটা পর্যায়ে জড়িয়ে রয়েছে ফেলে আসা দিনের বহু না-বলা গল্প ও ইতিহাস।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, মোঘল সম্রাট আকবরের আমল থেকেই এই অঞ্চলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজপরিবারের যোগাযোগ। উত্তর প্রদেশের কনৌজ থেকে বাংলায় এসে দামোদর ও শালী নদীর মধ্যবর্তী এলাকায় নিজেদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তৎকালীন শাসকরা। বাঁকুড়ার মালিয়াড়া গ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সেই জমিদারির জাঁকজমক ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রজাদের ঢল, বাইজি নাচ, যাত্রার আসর আর রাজকোষের উপচে পড়া প্রাচুর্যে সেসময় জমজমাট থাকত এই রাজবাড়ি।

সময়ের পালাবদলে আজ রাজা নেই, নেই সেই রাজপাট বা আগের মতো বিপুল ধনসম্পদও। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই পুজোর নিয়মনীতিতে বিন্দুমাত্র ছেদ পড়েনি। বংশপরম্পরায় আজও একই নিষ্ঠা ও নিয়মে হয়ে আসছে দেবীর আরাধনা। রাজবাড়ির প্রকাণ্ড ঠাকুরদালানে অষ্টধাতুর মূর্তিতে পূজিতা হন দেবী। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত একটানা হোম-যজ্ঞের পাশাপাশি আজও সন্ধিপুজোর সময় নিয়ম মেনে বন্দুক বা তোপ দেগে সূচনা করা হয়।

কালের নিয়মে রাজবাড়ির বিশাল দেওয়াল আর বেলজিয়াম কাঁচের ঝাড়বাতিতে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু শরতের ভোরে যখন নাটমন্দিরে বেজে ওঠে ঘণ্টা আর ধূপ-ধুনোর গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে বাতাস, তখন যেন টাইম মেশিন চড়ে চোখের পলকে অতীতে ফিরে যান স্থানীয় বাসিন্দারা। আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া সেই বনেদিয়ানার ছোঁয়া পেতে আজও শারদোৎসবে কৌতূহলী মানুষের নজর থাকে বাঁকুড়ার এই ঐতিহাসিক রাজবাড়ির দিকেই।