ভোটের ফল বলছে বিদায় নিশ্চিত, কিন্তু কীভাবে ফের গদি বাঁচাতে চলেছেন নেতানিয়াহু? জানলে চমকে যাবেন!

ইসরায়েলের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন ঘিরে উত্তাপ তুঙ্গে। তবে ভোটের ফলাফলের চেয়েও সেখানে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—নির্বাচনের পর কে হবেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী? গত মাসের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর শাসক জোট ১২০-সদস্যের নেসেট বা সংসদে মাত্র ৫৩টি আসন জিতেছে। অন্যদিকে, তাঁর বিরোধী দলগুলি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জাদুকরী পরিসংখ্যান ছাড়িয়ে মোট ৬৭টি আসন নিজেদের দখলে নিয়েছে। প্রাথমিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় নেতানিয়াহুর বিদায় ও পদত্যাগ করার কথা থাকলেও, পর্দার পিছনের রাজনৈতিক সমীকরণ এবং জট জটিল পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এমন কিছু অপ্রত্যাশিত মারপ্যাঁচ তৈরি হচ্ছে, যা নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রী পদে টিকে থাকার আশা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রাক্তন সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট সরকার গঠনের জন্য ইতিমধ্যে রাষ্ট্রপতির কাছে ৬৭ জন আইনপ্রণেতার সমর্থনের দাবি পেশ করেছে। তা সত্ত্বেও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবসান এখনই সুনিশ্চিত নয়। এর মূল কারণ হলো, আইজেনকোটকে সমর্থনকারী সব দল তাঁর সাথে যৌথভাবে সরকার গঠনে আদৌ ইচ্ছুক নয়। বিরোধী দলগুলির নিজেদের মধ্যেই তীব্র মতপার্থক্য রয়েছে, বিশেষ করে আরব দলগুলির সাথে জোট গঠন করা নিয়ে তাদের মধ্যে ঘোর অনীহা ও বিরোধ দেখা দিয়েছে।

ইসরায়েলি রাজনীতিতে নেতানিয়াহুর টিকে থাকার প্রধান কয়েকটি সমীকরণ ও পথ নিচে আলোচিত হলো:

১. বিরোধীদের মধ্যে পারস্পরিক বিভাজন: ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ৬১ জন এমপির সমর্থন প্রয়োজন। নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি আসন পেলেও গাদি আইজেনকোটের বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন এবং আরব দলগুলির দখলে রয়েছে ১৯টি আসন। আরব দলগুলির সমর্থন পেলে আইজেনকোটের সংখ্যা ৬৭ জনে পৌঁছালেও, এই সমর্থন নিয়ে বিরোধীদের মধ্যে তীব্র অনৈক্য রয়েছে। তাঁরা যদি কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হন, তবে আইজেনকোটের পক্ষে সরকার গঠন অসম্ভব হয়ে পড়বে, যা পরোক্ষভাবে নেতানিয়াহুর পক্ষেই সুবিধা করে দেবে।

২. ছোট দলগুলির সমর্থন আদায়: নেতানিয়াহুর জোটের ৫৩টি আসন থাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে আর মাত্র আটটি আসন প্রয়োজন। ফলে তাঁকে কিছু বিরোধী সাংসদ বা ছোট দলগুলির সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর প্রাক্তন মিত্র, অতি-গোঁড়া ইহুদি দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম (ইউটিজে)-এর সাতটি আসন রয়েছে, যারা এবার নেতানিয়াহুকে সমর্থন করেনি। ধর্মীয় ছাত্রদের সামরিক পরিষেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়ে তাঁদের মতপার্থক্য রয়েছে। যদি নেতানিয়াহু এই দলটিকে পুনরায় নিজের জোটে ফিরিয়ে আনতে সফল হন, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য তাঁর মাত্র একজন সাংসদের সমর্থন প্রয়োজন হবে।

৩. সরকার গঠনের দ্বিতীয় ও বিকল্প সুযোগ: ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজোগ প্রথমে আইজেনকোটকে সরকার গঠনের সুযোগ দিতে পারেন। এর জন্য তিনি ২৮ দিন সময় পাবেন এবং প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন বাড়াতে পারবেন। এই সময়ের মধ্যে আইজেনকোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে ব্যর্থ হলে, রাষ্ট্রপতি অন্য কোনো সংসদ সদস্যকে সুযোগ দেবেন, যেখানে নেতানিয়াহু অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে উঠে আসতে পারেন। আইজেনকোটের সম্ভাব্য ব্যর্থতাই নেতানিয়াহুর জন্য ক্ষমতা ধরে রাখার পথ প্রশস্ত করতে পারে।

৪. জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনের সম্ভাবনা: যদি নেতানিয়াহু এবং আইজেনকোট একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছান, তবে উভয় পক্ষ মিলে একটি জাতীয় ঐক্য সরকার গঠন করতে পারে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পদ ভাগাভাগির জন্য আবর্তনশীল বা রোটেশন সূত্র থাকতে পারে। যদিও আইজেনকোট ইতিমধ্যেই নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে সরকার গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, তবুও রাজনীতির মাঠে যেকোনো মুহূর্তেই সমীকরণ বদলে যেতে পারে।

৫. পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার: সরকার গঠনের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ইসরায়েলে নতুন করে নির্বাচন হতে পারে। মার্কিন কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিস (সিআরএস)-এর নিয়ম অনুযায়ী একাধিক ধাপে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলে। এর পরেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা না মিললে সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন ঘোষণা করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়া চলাকালীন নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকারই তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে দেশ পরিচালনা করবে এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই বহাল থাকবেন। ফলে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারেন নেতানিয়াহু।