বকেয়া ডিএ নিয়ে ঐতিহাসিক ঘোষণা! ৩০ নভেম্বরের ডেডলাইনে কাদের মুখে চওড়া হাসি?

রাজ্যের সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীদের জন্য বহু প্রতীক্ষিত ঘোষণা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (DA) মিটিয়ে দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এই কাজের জন্য প্রায় চার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করার কথা জানানো হলেও, ঘোষণার পরেই কর্মচারী মহলে স্বস্তির বদলে তীব্র অসন্তোষ ও বিতর্কের ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে গ্রান্ট-ইন-এইড (Grant-in-Aid) ভুক্ত শিক্ষক ও কর্মীদের বকেয়া নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা পরিস্থিতির আরও জটিল করে তুলেছে।
১. ডিএ ঘোষণা ও ৪ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ
বুধবার নবান্নে এক সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্যের সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীদের বকেয়া ডিএ আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মিটিয়ে দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়নে এই খাতে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের বকেয়া পাওয়ার আশায় প্রাথমিক ভাবে বহু কর্মী স্বস্তি পেলেও, অচিরেই সেই আনন্দ ক্ষোভে রূপ নিতে শুরু করে।
২. হিসাবের গরমিল ও গ্রান্ট-ইন-এইড কর্মীদের বঞ্চনার শঙ্কা
ঘোষণার পরেই কর্মচারী মহলের বড় একটি অংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সংগঠনগুলির প্রধান অভিযোগ, এই ঘোষণায় কর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি সম্পূর্ণ পূরণ হচ্ছে না। সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষক, শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীদের বকেয়া নিয়ে। সরকারি কোষাগার থেকে বেতন পাওয়া কর্মীদের প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই এই বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। ফলে এই অংশের জন্য স্পষ্ট রূপরেখা ঘোষণা না হলে সিংহভাগ কর্মীই বঞ্চিত হবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
৩. ইন্দু মলহোত্র কমিটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
গ্রান্ট-ইন-এইড কর্মীদের বঞ্চনা এড়াতে মুখ্যমন্ত্রী বারবার ডিসেম্বরে ‘ইন্দু মলহোত্র কমিটি’র বৈঠকের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে কর্মচারী প্রতিনিধিদের স্পষ্ট যুক্তি, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এমন কোনও শর্ত নেই যে কমিটির বৈঠক না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মীদের বকেয়া আটকে রাখতে হবে। কমিটির দোহাই দিয়ে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন তুলে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তাঁরা।
৪. ৪২ থেকে ৪৫ হাজার কোটির দাবি বনাম ৪ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ
সরকার ঘোষিত প্রায় চার হাজার কোটি টাকার সঙ্গে কর্মচারী সংগঠনগুলির নিজস্ব হিসাবের বিস্তর ফারাক রয়েছে। সংগঠনগুলির দাবি, শুধুমাত্র গ্রান্ট-ইন-এইড কর্মীদের বকেয়া মেটাতেই সরকারের অন্তত ৪২ থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। অঙ্কের এই বিরাট ব্যবধানই বর্তমান অসন্তোষের মূল কারণ।
৫. রাজনৈতিক ও কর্মী মহলের কড়া প্রতিক্রিয়া
কো-অর্ডিনেশন কমিটি: সিপিএম-সমর্থিত কো-অর্ডিনেশন কমিটির নেতা বিশ্বজিৎ গুপ্ত চৌধুরীর মতে, সুপ্রিম কোর্ট ইন্দু মলহোত্র কমিটিকে নির্দেশ দিয়েছিল কিস্তির সংখ্যা ও রাজ্যের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করতে, কে ডিএ পাবেন তা ঠিক করতে নয়। সরকার আগের নির্দেশিকা না মানলে নতুন নির্দেশিকা এনে তা স্পষ্ট করুক।
সংগঠনের হুঁশিয়ারি: বামপন্থী শিক্ষক সংগঠন বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির নেতা স্বপন মণ্ডলের দাবি, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হলে এর কঠিন রাজনৈতিক পরিণতি ভোগ করতে হবে।
কর্মচারী পরিষদ: বিজেপি-মনোভাবাপন্ন রাজ্য সরকারি কর্মচারী পরিষদের সভাপতি দেবাশিস শীলও একাংশ কর্মীর ডিএ পাওয়ার বিষয়টি সামনে এলেও অন্য অংশের ক্ষোভকে স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন।
পরিবেশ ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় পঞ্চায়েত ও পুরসভার কর্মচারী ইউনিয়নগুলি বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ভাবছে। শেষ পর্যন্ত সরকার এই জটিলতা কাটাতে কী পদক্ষেপ করে, সেটাই এখন দেখার।