নড়াচড়া করে জলের ওপর বাড়ি! গুগল ম্যাপও হার মানে ভারতের এই জাদুকরী ভাসমান গ্রামে

ঘুম থেকে উঠে দরজা খুললেই যদি দেখেন আপনার বাড়ির পায়ের তলার মাটি সরে গেছে এবং সামনে থইথই করছে জল, তবে কেমন লাগবে? রূপকথার মতো মনে হলেও এটি পুরোপুরি বাস্তব। মণিপুরের বিষ্ণুপুর জেলায় লোকটাক হ্রদের বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ‘চম্পু খাংপোক’ (Chumphu Khangpok)। এটি কেবল ভারতেরই নয়, বিশ্বের অন্যতম এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ভাসমান গ্রাম, যেখানে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এক অবিশ্বাস্য রোমাঞ্চ।

এই অদ্ভুত গ্রামের পুরোটাই তৈরি হয়েছে ‘ফুমদি’ (Phumdi) নামের এক প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর। ফুমদি হলো জলজ উদ্ভিদ, পচা পাতা, মাটি এবং জৈব আবর্জনা মিলে তৈরি এক ধরনের ভাসমান দ্বীপ। লোকটাক হ্রদের বুকে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই ফুমদিগুলো এতটাই শক্তিশালী ও ঘন যে, এর ওপর দিব্যি ঘরবাড়ি তৈরি করে বসবাস করছেন মানুষ। বর্তমানে এখানে প্রায় তিন শতাধিক বাঁশের কুঁড়েঘর রয়েছে। এই দ্বীপগুলোর ওপর হাঁটলে মনে হবে যেন কোনো নরম স্পঞ্জের ওপর পা রেখেছেন, যার নিচে ছলছল করছে গভীর জল। বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন হ্রদের জলস্তর বাড়ে, তখন গোটা গ্রামটি জলের স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওঠানামা করতে থাকে।

সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, এই গ্রামের কোনো নির্দিষ্ট বা স্থায়ী ঠিকানা নেই। ফুমদিগুলো স্থির নয়; বাতাসের গতি এবং জলের স্রোতের টানে এগুলো ক্রমাগত নিজেদের স্থান পরিবর্তন করে। আজ আপনার বাড়ির ঠিকানা যেখানে রয়েছে, কাল সকালে দেখা যাবে সেটি ১০ মিটার দূরে সরে গেছে। এই কারণেই এখানে আধুনিক জিপিএস বা গুগল ম্যাপ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়, কাজ করে না কোনো নির্দিষ্ট পিন কোডও। যোগাযোগ বা যাতায়াতের একমাত্র এবং প্রধান ভরসা ছোট ডিঙি নৌকা।

এখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মূল জীবিকা মৎস্যজীবী হিসেবে জীবনযাপন করা। লোকটাক হ্রদের মাছ ধরা এবং ফুমদির ওপর চাষবাস করেই তাদের সংসার চলে। শিশুদের পড়াশোনার জন্য এখানে রয়েছে একটি আস্ত ভাসমান স্কুল, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা প্রতিদিন ছোট নৌকায় চেপে যাতায়াত করে। যান্ত্রিক সভ্যতার কোলাহল থেকে বহুদূরের এই গ্রামে সন্ধ্যার পর নেমে আসে পরম শান্তি। গাড়ির হর্ন বা বায়ুদূষণের নামগন্ধ নেই; চারপাশে শুধু জলের কলতান আর মাথার ওপর তারায় ভরা আকাশ। এই জাদুকরী গ্রাম দেখতে হলে আপনাকে প্রথমে মণিপুরের মৈরাং শহরে পৌঁছাতে হবে এবং সেখান থেকে লোকটাক হ্রদের জলে নৌকা ভাসিয়ে চলে যেতে হবে চম্পু খাংপোক। নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে এবং প্রকৃতির একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে যেতে এই ভাসমান গ্রাম এক অতুলনীয় অভিজ্ঞতা উপহার দেবে।