‘তুমি আসল হিরো!’ নরেন্দ্র মোদী থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প—রক্তাক্ত জখম অবস্থাতেও অলৌকিক কাণ্ড ঘটানো ভারতীয় পাইলটকে কুর্নিশ বিশ্বনেতাদের

দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ‘ফ্লাইদুবাই’-এর এফজেড ১০৭৩ (FZ1073) ফ্লাইটের পরিণতি হতে পারত এক চরম মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনা। তবে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ক্যাপ্টেন স্মিথ মচ্ছরের অভূতপূর্ব সাহসিকতা ও মানসিক দৃঢ়তার কারণে এক ভয়াবহ বিপর্যয় ও হাইজ্যাকিংয়ের হাত থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পেলেন ১৮০ জন যাত্রী ও বিমানকর্মী। মাঝআকাশে গুরুতর রক্তাক্ত ও জখম হওয়া সত্ত্বেও নিজের জীবন বাজি রেখে কো-পাইলটের সেই ঘাতক পরিকল্পনা সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দেন তিনি। বর্তমানে গুরুতর আহত অবস্থায় সৌদি আরবের একটি হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (ICU) চিকিৎসাধীন রয়েছেন এই অসমসাহসী পাইলট।
বুধবার দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১৭৪ জন যাত্রী নিয়ে তেল আভিভের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল বিমানটি। যাত্রীদের মধ্যে ১৫০ জন ইজরায়েলি নাগরিক এবং ২৭ জন শিশুও অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিমানটি যখন ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ছিল, ঠিক সেই সময়েই ককপিটে আচমকা তাণ্ডব শুরু করেন ওমানের নাগরিক কো-পাইলট। অভিযোগ, বোয়িং বিমানের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ নিজের হাতে নিতে এবং বিমানটিকে অন্য কোথাও আছড়ে ফেলে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে তিনি ছুরি নিয়ে হঠাৎই আক্রমণ চালান ক্যাপ্টেন স্মিথ মচ্ছরের ওপর।
একাধিকবার সজোরে ছুরিকাঘাতের ফলে মারাত্মকভাবে জখম হন ক্যাপ্টেন মচ্ছর। তবে চরম শারীরিক যন্ত্রণার মুখেও তিনি বিমানের কন্ট্রোল হাতছাড়া হতে দেননি এবং হামলাকারীকে সাহসিকতার সঙ্গে রুখে দাঁড়ান। লড়তে লড়তে একপর্যায়ে কৌশলে তিনি ককপিটের দরজা খুলে দিতে সক্ষম হন। ভেতরের ভয়াবহ তাণ্ডব দেখে বাকি কেবিন ক্রু ও যাত্রীরা দ্রুত ককপিটে ঢুকে ঘাতক কো-পাইলটকে ধরে ফেলেন এবং সম্পূর্ণ কাবু করেন। এই ধস্তাধস্তির সময় বিমানটি আচমকা কয়েক মিনিটের মধ্যে ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে আসায় যাত্রীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বিমানে থাকা দুজন রিলিফ পাইলট দায়িত্বভার গ্রহণ করলে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে বিমানটিকে নিরাপদে জরুরি অবতরণ করানো সম্ভব হয়।
এই ভারতীয় বীর ক্যাপ্টেনের অসামান্য সাহসিকতাকে কুর্নিশ জানিয়েছে বিশ্ব নেতৃত্ব। এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেলে এক বিশেষ বার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁকে ‘সত্যিকারের হিরো’ হিসেবে অভিহিত করে লিখেছেন, “সবচেয়ে ভয়াবহ বিপদের মুখে এবং গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও তিনি অসীম সাহসিকতা দেখিয়েছেন। অন্যদের জীবন রক্ষার অটুট সংকল্প ফুটিয়ে তুলেছেন। ক্যাপ্টেন মচ্ছরকে নিয়ে গোটা ভারত আজ গর্বিত।” পাশাপাশি তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন তিনি। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও ক্যাপ্টেন মচ্ছরের অসামান্য লড়াইয়ের প্রশংসা করে জানান, নিজের জীবন বাজি রেখেই তিনি ১৭৪ জন যাত্রীর প্রাণ বাঁচিয়েছেন। অন্যদিকে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “গুরুতর আহত অবস্থায় বিচারবুদ্ধি না হারিয়ে তিনি যে কাজ করেছেন, তা কোনো অলৌকিকের চেয়ে কম নয়। তিনি একজন সত্যিকারের হিরো।”
বীর পাইলট স্মিথ মচ্ছরের জন্ম ভারতের গুজরাটে। ২০১১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তিনি ‘স্পাইসজেট’-এ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছেন এবং বিগত চার বছর ধরে তিনি ‘ফ্লাইদুবাই’-এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। পেশাদার বোয়িং ৭৩৭ বিমান চালনায় তাঁর ১৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাণিজ্যিকভাবে প্রায় ৯,৭৫০ ঘণ্টা বিমান ওড়ানোর সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন লাইন ট্রেনিং ক্যাপ্টেন হিসেবেও অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব সামলেছেন। বর্তমানে সৌদি আরবের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই ভারতীয় পাইলটের স্বাস্থ্যের যাবতীয় খোঁজখবর রাখছে ভারতীয় প্রশাসন। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (UAE) ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রেখে পুরো বিষয়টির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।