জাতীয় পরিবেশ আদালতের নির্দেশ উড়িয়ে ফের সরোবর খোলার প্রস্তুতি? সরকারের নতুন চালে মাথায় হাত পরিবেশপ্রেমীদের!

দক্ষিণ কলকাতার ‘ফুসফুস’ বলে পরিচিত রবীন্দ্র সরোবর নিয়ে সরকারের এক মন্তব্যে নতুন করে শোরগোল তৈরি হয়েছে রাজ্য রাজনীতি ও পরিবেশকর্মী মহলে। এতদিন আদালতের কড়া নির্দেশে বন্ধ থাকলেও, এবার রবীন্দ্র সরোবরে ফের ছট পুজো পালন করতে দেওয়ার বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করছে রাজ্য সরকার। সম্প্রতি ছট পুজোর প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে গঙ্গার ঘাট পরিদর্শনে গিয়ে এই ইঙ্গিত দিয়েছেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। আর মন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর থেকেই তীব্র উদ্বিগ্ন পরিবেশবিদ ও স্থানীয় প্রাতঃভ্রমণকারীরা।
কী বলেছেন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী?
হাওড়া ও কলকাতা পুরসভার কমিশনারসহ একাধিক আধিকারিককে সাথে নিয়ে গঙ্গার বিভিন্ন ঘাট পরিদর্শনের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। এবারও কি রবীন্দ্র সরোবর বন্ধ রাখা হবে?—এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,
“না, আমরা ভাবছি এইবার সরোবর খুলে দেব। ওখানকার মানুষগুলো কোথায় যাবে বলুন! আর ছট পালনে তো জল নোংরা হয় না। শুধু প্রদীপ জ্বালানো হয় আর পা একটু ডোবানো হয়। আমরা নজর রাখব যাতে নোংরা না হয়।”
জাতীয় পরিবেশ আদালতের কড়া নির্দেশিকার কথা মনে করিয়ে দিলে মন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, সরকার এ বিষয়ে আদালতের সাথে কথা বলবে। একই সাথে তিনি যোগ করেন, “মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ইচ্ছে আছে সরোবর খুলে দেওয়া হবে। বিগত সরকার ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করত। আমরা চাই না ধর্মাচার পালনে বাধা দিতে।”
কেন সিঁদুরে মেঘ দেখছেন পরিবেশকর্মীরা?
দক্ষিণ কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সুবিশাল এই জলাশয় ও সবুজ ঘেরা এলাকাটি ‘জাতীয় সরোবর’-এর মর্যাদা প্রাপ্ত। একসময় এই সরোবরে অবাধে ছট পুজো পালনের কারণে ভারী সাউন্ড সিস্টেম, ডিজে এবং আতশবাজির শব্দে বিপন্ন হয়ে উঠত এখানকার পক্ষীকুল। তাছাড়া প্রদীপের তেল, মাটির সামগ্রী, খড় ও রাসায়নিক বর্জ্য ফেলার ফলে জলাশয়ের বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৮ সালে জাতীয় পরিবেশ আদালত রবীন্দ্র ও সুভাষ সরোবরে ছট পুজো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সেই নির্দেশ মেনে বিকল্প হিসেবে পুরসভার তরফে অস্থায়ী জলাশয়ের ব্যবস্থাও করা হয়। বর্তমানে এমনিতেই রবীন্দ্র সরোবরের জলের গুণগত মান আশঙ্কাজনক, পলির স্তর জমেছে এবং জলজ জীব ও মাছ মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এই অবস্থায় কেএমডিএ (KMDA) যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরামর্শ নিয়ে পলি উত্তোলনের পরিকল্পনা করছে।
প্রয়োজনে রাস্তায় নামা ও আইনি লড়াইয়ের হুমকি
সরকারের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন পরিবেশপ্রেমীরা:
পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ: বিজ্ঞান মঞ্চের সদস্য শেখ সোলেমান বলেন, “ওটা একটি জাতীয় সরোবর, সেটা মন্ত্রীর জানা উচিত। আমরা ধর্মাচারের বিরুদ্ধে নই, কিন্তু পরিবেশ নষ্ট করে তা হতে পারে না। বিকল্প পথ খোঁজা প্রয়োজন। প্রয়োজনে আমরা ফের রাস্তায় নামব এবং মন্ত্রীকে ডেপুটেশন দেব।”
পরিবেশ-কর্মী নব দত্ত: তিনি কড়া সুর চড়িয়ে বলেন, “ক্ষমতা আছে বলেই যা ইচ্ছে করা যায় না। গায়ের জোরে এটা করা হলে তার খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকে।”
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সোমেন্দ্র মোহন ঘোষ: তিনি মনে করিয়ে দেন, “এটি কোনো সাধারণ পুকুর নয়, একটি জাতীয় সরোবর। আজ সকালেও লেকে মাছ মারা গিয়েছে। জলের গুণমান ফেরানোর দিকে নজর না দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিলে সুপ্রিম কোর্ট ও পরিবেশ আদালতের নির্দেশের ওপর হস্তক্ষেপ করা হবে।”
আদালতের নিষেধাজ্ঞাকে পাশ কাটিয়ে রাজ্য সরকার কীভাবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে এবং পরিবেশকর্মীদের আন্দোলন কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।