সাড়ে ৬ বছরে তৈরি হলো মাত্র কয়েক মিনিটের দৃশ্য! নীতীশ তিওয়ারির ‘রামায়ণ’-এর নেপথ্য কাহিনি জানলে চোখ কপালে উঠবে

মহাকাব্যের পাতায় রাবণ ও জটায়ুর সংঘর্ষের রোমাঞ্চকর উপাখ্যান কারোরই অজানা নয়। মা সীতাকে হরণ করে লঙ্কার উদ্দেশে ওড়ার সময় সেই মহাকাব্যের সাক্ষী হয়েছিল আকাশ। কিন্তু পরিচালক নিতেশ তিওয়ারির বহুচর্চিত ও বহুল প্রতীক্ষিত মেগা প্রজেক্ট ‘রামায়ণ’ ছবিতে এই কিংবদন্তি যুদ্ধকে যেভাবে ফুটিয়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে, তার নেপথ্য প্রস্তুতি শুনলে যে কারোরই চোখ কপালে উঠবে। সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে পরিচালক নিজেই ফাঁস করেছেন এক অবিশ্বাস্য তথ্য—পর্দায় মাত্র কয়েক মিনিটের একটি নিখুঁত অ্যাকশন সিকোয়েন্সকে জীবন্ত করে তুলতে নির্মাতাদের সময় লেগেছে দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর!

চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় ভিএফএক্স এবং শুটিংয়ের বিভিন্ন স্তরে কী বিপুল পরিমাণ রক্ত ও ঘাম ঝরাতে হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পরিচালক জানান যে জটায়ু ও রাবণের সেই বিধ্বংসী লড়াইয়ের প্রথম পরিকল্পনা থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ফ্রেম পর্দায় আসার আগে পর্যন্ত দীর্ঘ সাড়ে ছ’টি বছর পার হয়ে গিয়েছে। কেবল একজন নির্দেশকের ভাবনা বা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের দক্ষতায় এমন মহাকাব্যিক কাজ ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব। এই বিশাল ও জটিল কর্মযজ্ঞের পেছনে দিনরাত এক করে কাজ করেছেন হাজার হাজার নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী ও কলাকুশলী। প্রত্যেকের সম্মিলিত ও নিখুঁত প্রচেষ্টার ফলেই পৌরাণিক কল্পনার সেই মুহূর্তকে বাস্তবের মোড়কে রূপ দেওয়ার এই অসাধ্যসাধন সম্ভব হয়েছে।

এই পুরো যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল লঙ্কাধিপতি রাবণের ঐতিহাসিক ‘পুষ্পক বিমান’। আর সেই কাল্পনিক আকাশযানটি ঠিক কেমন দেখতে হবে, তা নিখুঁতভাবে চূড়ান্ত করতেই শিল্পীদের প্রায় দু’টি বছর কেটে গিয়েছে। প্রথমে যে প্রাথমিক নকশা বা ডিজাইন নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল, পরবর্তীতে তা বাতিল করে প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি ভিন্ন ভিন্ন মডেল তৈরি করা হয়। নির্মাতাদের মূল লক্ষ্যই ছিল—শুধু দেখতে চমৎকার কোনো পৌরাণিক উড়ন্ত যান বানিয়ে খালাস পাওয়া নয়, বরং দর্শকের মনে যেন এতটুকুও প্রশ্ন না জাগে যে অমন বিশাল আকারের একটি বস্তু কীভাবে আকাশে ভাসতে পারে। তার গঠনশৈলী এবং বৈজ্ঞানিক উড্ডয়নের পেছনে থাকতে হবে অকাট্য ও বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি। নিতেশ তিওয়ারির মতে, সেকালের প্রতিটি বিস্ময়কর আবিষ্কারের পেছনেও কোনো না কোনো গভীর বিজ্ঞান লুকিয়ে ছিল। সেই ভাবনা থেকেই পুষ্পক বিমানের নকশায় বাস্তবসম্মত অ্যারোডাইনামিকস বা উড্ডয়নবিদ্যার যুক্তি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।

বিমানের নকশা নিয়ে এই দীর্ঘ ও রুদ্ধশ্বাস পরীক্ষা-নিরীক্ষার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল গোটা যুদ্ধদৃশ্যের কোরিওগ্রাফির ওপর। কারণ শুরুর দিকের বিমানের কাঠামো মাথায় রেখে জটায়ু ও রাবণের লড়াইয়ের যে ছক কষা হয়েছিল, চূড়ান্ত নকশা আসার পর দেখা গেল তা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ফলে পুরনো সমস্ত পরিকল্পনা ফেলে দিয়ে নতুন করে অঙ্ক কষতে হয়েছে। জটায়ু কোন দিক থেকে তেড়ে এসে আক্রমণ করবে, বিমানের ঠিক কোন অংশে সে আঘাত হানবে, কিংবা কোন ফাঁকফোকড় দিয়ে তার প্রবেশ সম্ভব—সবকিছুই আবার নতুন করে সাজাতে হয়েছে। বিমানের গঠনে একটি সুদৃশ্য গম্বুজের মতো অংশ যুক্ত হওয়ায় জটায়ুর ওড়ার গতিবিধি ও কৌশল নিয়ে নতুন করে হিসাব করতে হয়েছে টিমকে। অর্থাৎ, একটি মাত্র কাল্পনিক যানের নকশা বদলানোর কারণে কয়েক মিনিটের ওই যুদ্ধদৃশ্যের গোটা ব্লু-প্রিন্টটাই বারবার নতুন করে বদলাতে হয়েছে।

শুধু কম্পিউটারের ডিজিটাল স্ক্রিনে চরিত্র ফুটিয়ে তুলেই নির্মাতারা তাঁদের দায়িত্ব শেষ করেননি। জটায়ুর বিশাল আকার এবং তার শারীরস্থানিক গঠন সম্পর্কে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের স্পষ্ট ও বাস্তব ধারণা দিতে আর্ট ডিপার্টমেন্ট বিশেষভাবে তৈরি করেছিল ২৪ ফুট উঁচু একটি বিরাট কঙ্কালের মডেল। শুটিং ফ্লোরে অভিনেতাদের ঠিক সামনেই রাখা হতো সেটি, যাতে তাঁরা জটায়ুর সঠিক উচ্চতা, অবস্থান এবং বিশালতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকেন। বিশেষ করে মারকাটারি দৃশ্যগুলির সময় ডায়লগ ডেলিভারির সময় চোখের দৃষ্টি বা সঠিক আই-লাইন বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই লাইভ মডেলটি অভাবনীয়ভাবে সাহায্য করেছিল। পর্দায় যে অতিকায় পক্ষীরাজকে ভেসে থাকতে দেখা যাবে, তার উপস্থিতি যেন অভিনয়শিল্পীদের কাছেও সম্পূর্ণ বাস্তব ও জীবন্ত মনে হয়, সেই উদ্দেশ্যেই এই বিশেষ আয়োজন করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, পুষ্পক বিমানের বিশালতাও কম চাঞ্চল্যকর নয়। ছবির খ্যাতনামা প্রডাকশন ডিজাইনার ও আর্ট ডিরেক্টর রমেশ আন্দালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিমানটির মোট ব্যাস ছিল প্রায় ৫০ ফুট। স্টুডিওর চার দেওয়ালের ভেতর একবারে এত বিশাল আকৃতির কাঠামো তৈরি করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। ফলস্বরূপ, সেটিকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চারটি আলাদা অংশে বিভক্ত করে আলাদা আলাদা নির্মাণ করা হয়েছিল। এই ধরনের অণু-পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রস্তুতি ও নিখুঁত পরিকল্পনা দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ‘রামায়ণ’-এর অলৌকিক দুনিয়াকে দর্শকের সামনে জীবন্ত করে তুলতে নির্মাতারা কতটা গভীরে গিয়ে ম্রিয়মাণ পরিশ্রম করেছেন।

ছবির ভিএফএক্স নিয়ে চলা বিভিন্ন সমালোচনা এবং আজকের দিনে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা)-এর বাড়বাড়ন্ত নিয়ে সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে মুখ খুলেছেন এই মেগা প্রজেক্টের অন্যতম প্রধান অভিনেতা রণবীর কাপুর। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, বড় কোনো দৃষ্টিনন্দন ও চোখধাঁধানো দৃশ্য পর্দায় ফুটিয়ে তোলার পর যদি তক্ষুনি সেটিকে সস্তা এআই দিয়ে তৈরি বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়, তবে সেই কাজের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার ভিএফএক্স শিল্পীর হাড়ভাঙা পরিশ্রম ও না-ঘুমোনো রাতগুলো পুরোপুরি অন্তরালে চলে যায়। একটি মাত্র ফ্রেমকে নিখুঁত ও ত্রুটিহীন করে তুলতে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের হাজার হাজার ডিজিটাল আর্টিস্ট দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। প্রতিটি ফ্রেমের আলো, গভীরতা, গতির সুক্ষ্মতা এবং বাস্তবের ফিলিংস তৈরি করতে যে পর্বতপ্রমাণ সময় ও শ্রম লাগে, তা বাইরে থেকে সবসময় অনুমান করা যায় না। তাই কোনো কাজের সমালোচনা করার আগে তার নেপথ্যের কারিগরদের চরম অবদানকে সম্মান জানানো অত্যন্ত জরুরি।

পরিচালক নিতেশ তিওয়ারির এই উচ্চাভিলাষী দুই পর্বের মহাকাব্যিক প্রজেক্টে ভগবান রামের ভূমিকায় রণবীর কাপুর, সীতার চরিত্রে জনপ্রিয় দক্ষিণী অভিনেত্রী সাই পল্লবী এবং লঙ্কাধিপতি রাবণের কালজয়ী চরিত্রে মেগাস্টার যশ দুর্দান্ত অভিনয় করছেন। এছাড়াও এই বিশাল স্টার-কাস্টে সানি দেওল, রবি দুবে, এবং প্রবীণ অভিনেতা অরুণ গোভিলের মতো একাধিক পরিচিত এবং শক্তিশালী মুখের সমাহার রয়েছে। ছবিটির প্রথম পর্ব ২০২৬ সালের দীপাবলিতে এবং দ্বিতীয় পর্ব ২০২৭ সালে বিশ্বজুড়ে বড় পর্দায় মুক্তির চূড়ান্ত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে, ‘রামায়ণ’-এর এই হাই-ভোল্টেজ যুদ্ধদৃশ্যের পেছনের এই গল্প কেবল একটি বিশাল বাজেটের সিনেমার প্রস্তুতির কিসসা নয়, বরং সেলুলয়েডের পর্দায় নিখুঁত শিল্পসৃষ্টির প্রতি নির্মাতাদের আপসহীন নিষ্ঠা ও সাধনার এক অনন্য দলিল। পর্দায় দর্শক হয়তো মোটে কয়েক মিনিটের জন্য জটায়ু ও রাবণের এই রোমহর্ষক লড়াই উপভোগ করবেন, কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডের বিনোদনের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে সাড়ে ছ’বছরের দীর্ঘ মানসিক পরিকল্পনা, অজস্র ব্যর্থ ও সফল নকশার পরীক্ষা এবং হাজার হাজার মানুষের রক্ত-ঘাম। মার্ভেল বা হলিউডের যেকোনো বিশ্বমানের ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতার সঙ্গে লড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ক্ষমতা এই ছবির আছে কি না, তার চূড়ান্ত রায় দেবে সেলুলয়েড। তবে একটা বিষয় জলের মতো পরিষ্কার—এই লড়াই কেবল রাবণ আর জটায়ুর নয়, বরং রূপালি পর্দায় নিছক কল্পনাকে একেবারে জীবন্ত করে তোলার জন্য হাজার হাজার নিঃস্বার্থ শিল্পীর দীর্ঘ সাধনার এক মহা-উপাসনা।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty