আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা! মার্কিন রাজনীতিতে নতুন মোড় আসতেই পুতিনের রাশিয়া কি এবার বেকায়দায়?

আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ের পর রাশিয়ার রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ। ক্রেমলিনের বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী জানুয়ারি মাসে ডেমোক্র্যাটরা মার্কিন সংসদ বা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ইউক্রেন হয়তো আগের চেয়ে অনেক বেশি মার্কিন সামরিক সাহায্য পেতে পারে। তা সত্ত্বেও মস্কো আশা করছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে তাঁর শান্তি আলোচনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেস্কোভ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মার্কিন নির্বাচনের এই ফলাফলের প্রভাব রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তি চুক্তি করানোর মার্কিন কৌশলের ওপর পড়া উচিত নয়। তিনি আরও জানান, রাশিয়া, ইউক্রেন এবং আমেরিকার উচ্চপর্যায়ের আধিকারিকদের মধ্যে পরবর্তী দফার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আগামী মঙ্গলবার ও বুধবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে, পেস্কোভ মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মানবিক উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাঁরই বিশেষ মধ্যস্থতায় গত সপ্তাহে রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেনীয় শহর ওলেশকির সংলগ্ন এলাকায় সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। এর ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত ওই অঞ্চলে জরুরি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে আনা সম্ভব হয়। মস্কো আশা প্রকাশ করেছে যে এই ধরনের মানবিক উদ্যোগ ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে। মার্কিন সংসদের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পালাবদলকে আমেরিকার একান্তই নিজস্ব রাজনৈতিক বিষয় বলে অ্যাখ্যা দিয়েছে রাশিয়া।
গত কয়েক মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলে রাশিয়ার অনুকূলে গিয়েছে বলেই মনে করা হয়েছে। আমেরিকা রাশিয়া থেকে সরাসরি ডিজেল আমদানির ঐতিহাসিক চুক্তি করেছে, যা বহু বছর ধরে চলে আসা মস্কো-বিরোধী মার্কিন নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির জন্য ট্রাম্প ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারের ওপর হামলা বন্ধ করার নির্দেশও দিয়েছিলেন। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি মহার্ঘ হওয়ার মূল কারণ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও ইরান যুদ্ধ। পাশাপাশি, রাশিয়ান অর্থনীতির ওপর নতুন করে কোনো কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার সিদ্ধান্তকেও মার্কিন স্বার্থে নেওয়া পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছিলেন ট্রাম্প। যদিও তাঁর এই পদক্ষেপে দুই দলের মার্কিন আইনপ্রণেতারাই তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
এই আবহেই আবার ইউক্রেনের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয় যে, ধনকুবের এলন মাস্কের কোম্পানি স্পেসএক্সের সামরিক ইন্টারনেট পরিষেবা ‘স্টারশিল্ড’-এর গতি কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইউক্রেনীয় সেনা ও ড্রোনের যোগাযোগ রক্ষায় এই প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকার কথা অস্বীকার করেছেন, তবে একে ইউক্রেনের ওপর কায়দা করে চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে হওয়া ডিজেল আমদানির চুক্তিও বড় আইনি জটের মুখে পড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বিভিন্ন ফেডারেল রাজ্যের তরফ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, এই ডিজেল চালান গ্রহণ করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এর জেরে আমেরিকার দিকে রওনা দেওয়া দুটি তেলের ট্যাঙ্কার বাধ্য হয়ে মাঝপথেই তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে নেয়। তবে মস্কো আশ্বস্ত করে জানিয়েছে যে আন্তর্জাতিক বাজারে রুশ জ্বালানি ও ডিজেল সরবরাহ যথারীতি অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রাণঘাতী ব্যালেস্টিক মিসাইল হামলা প্রতিহত করতে ইউক্রেনের কাছে আধুনিক মার্কিন প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেম অত্যন্ত জরুরি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বারবার আমেরিকার কাছে এই সামরিক সরঞ্জাম দ্রুত পাঠানোর জোরালো দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধের জেরে পেন্টাগনের নিজস্ব অস্ত্রের ভাঁড়ার অনেকটাই কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে নিজেদের ডিফেন্স স্টক রিফিল করার ওপর জোর দিচ্ছে। গত ৩০ অক্টোবর ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনের জন্য প্রায় ২.১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের প্যাট্রিয়ট মিসাইল বিক্রির চুক্তিতে সবুজ সংকেত দিয়েছিল। এর আগে কিয়েভ প্রশাসন বারবার অস্ত্র সরবরাহে শ্লথগতির অভিযোগ তুলে পেন্টাগনকে কাঠগড়ায় দাঁড়ায়।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে যেকোনো শান্তি চুক্তির জন্য জেলেনস্কির চেয়ে অনেক বেশি নমনীয় বলে মনে করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। উল্টোদিকে, ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টকে তিনি শান্তি প্রক্রিয়ার প্রধান অন্তরায় হিসেবে একাধিকবার চিহ্নিত করেছেন। গত বৃহস্পতিবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিভের সঙ্গেও ব্যক্তিগত বৈঠক করেন ট্রাম্প। দিমিত্রিভ মেলানিয়া ট্রাম্পের সেই মানবিক উদ্যোগের অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন, যেখানে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। যদিও সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে ট্রাম্প সরাসরি কোনো বৈঠকে অংশ নেননি, তবে ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে বড় কোনো কূটনৈতিক চুক্তির জোরালো ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন।
ওদিকে ডেমোক্র্যাটদের এই জয়ের ফলে মস্কোর ওপর চাপ যে বহুগুণ বাড়তে পারে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন রাশিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপতি দিমিত্রি মেদভেদেভ। তাঁর মতে, নতুন মার্কিন সংসদ গঠিত হওয়ার পর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সংঘাত এড়াতে ট্রাম্প হয়তো ইউক্রেনের ওপর আগের মতো মাত্রাতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকবেন। তবে রুশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্বাস গ্যালিয়ামোভের মতে, ট্রাম্পের জয়ের ঠিক পরেই শান্তি চুক্তি করে ফেলার যে সুবর্ণ সুযোগ পুতিনের সামনে এসেছিল, ক্রেমলিন সেই সুযোগ হাতছাড়া করেছে। বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মস্কোর জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তা সত্ত্বেও আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ জন ফ্ল্যাকের মতে, মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ট্রাম্পের স্বাধীন বৈদেশিক নীতিতে রাতারাতি বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করা তাদের পক্ষে সহজ হবে না। রাশিয়ার সিনিয়র সংসদ সদস্য কনস্ট্যান্টিন কোসাচেভ এবং এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারগউস সাকনাও একই সুরে মন্তব্য করেছেন যে, মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির মূল চাবিকাঠি সবসময় রাষ্ট্রপতির হাতেই ন্যস্ত থাকে। কোসাচেভের মতে, এই নির্বাচনের ধাক্কার পর ট্রাম্প আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আরও অনেক বেশি কঠোর ও শক্ত অবস্থান নিতে পারেন।