নবান্নের কড়া দাওয়াই! সরকারি প্রকল্পের বোর্ডে বাংলা ভাষা ব্যবহার বাধ্যতামূলক, চরম সময়সীমা বাঁধল রাজ্য

রাজ্যের সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে এক যুগান্তকারী ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এতদিন ধরে বিভিন্ন জেলায় সরকারি প্রকল্পের কাজের জায়গায় কেবল ইংরেজি ভাষায় তথ্যের বোর্ড বা হোর্ডিং লাগানোর যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল, তাতে এবার সিলমোহর বসাল নবান্ন। রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়াল স্বাক্ষরিত নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, এখন থেকে রাজ্যের সমস্ত সরকারি প্রকল্পের তথ্যের বোর্ডে বাংলা ভাষার ব্যবহার সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একইসঙ্গে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চল যেমন দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ে স্থানীয় মানুষের সুবিধার্থে নেপালি ভাষায় তথ্য প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে এই নতুন নির্দেশিকা কঠোরভাবে কার্যকর করার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

নবান্নের তরফে জানানো হয়েছে যে, বহু ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছিল কেন্দ্রীয় প্রকল্প কিংবা অর্থ কমিশনের অনুদানে চলা বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ইংরেজিতে সাইনবোর্ড ও হোর্ডিং টাঙানো হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ গ্রামীণ মানুষ অনেক সময়ই বুঝতে পারতেন না যে তাঁদের নিজ এলাকায় ঠিক কী ধরনের কাজ হচ্ছে, কোন প্রকল্পে কত কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বা কোন নির্মাণসংস্থা এর দায়িত্বে রয়েছে। এই বিভ্রান্তি দূর করতেই নবান্নের এই মাস্টারস্ট্রোক। নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, সরকারি প্রকল্পের প্রতিটি বোর্ডে কাজের বিবরণ, প্রকল্পের নাম, আনুমানিক খরচ, অর্থের উৎস, কাজ শুরু ও শেষের নির্ধারিত তারিখ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার নাম ও যোগাযোগের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করতে হবে। রাজ্যের সমস্ত সরকারি দপ্তর, পঞ্চায়েত, পৌরসভা, উন্নয়ন পর্ষদ এবং জেলা প্রশাসনকে এই নির্দেশ অবিলম্বে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পাহাড়ের আঞ্চলিক ভাষার প্রতি সম্মান জানিয়ে বিশেষ ছাড় ও নিয়ম রাখা হয়েছে। দার্জিলিং, কালিম্পং এবং গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল প্রশাসন বা জিটিএ-র অধীন এলাকায় নেপালি ভাষায় তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যেখানে প্রয়োজনে বাংলা ভাষাও ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কেন্দ্রের কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পের গাইডলাইনে যদি ইংরেজি বা হিন্দি ব্যবহারের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকে, তবে সেই ভাষা রাখা যাবে, কিন্তু বাংলা বা নেপালি ভাষাকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ইংরেজি বা হিন্দির দাপট আর বরদাস্ত করা হবে না। এছাড়া যে সমস্ত চলমান প্রকল্পে এখনও পর্যন্ত কোনো তথ্যের বোর্ড লাগানো হয়নি, সেগুলিতেও আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে বোর্ড বসাতে হবে এবং পুরোনো বোর্ডগুলি নতুন নিয়মে সংশোধন করতে হবে।

ভাষাগত পরিবর্তনের পাশাপাশি সরকারি কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে আরও একটি সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার। খুব শীঘ্রই প্রতিটি প্রকল্পের তথ্যের বোর্ডে অত্যাধুনিক ‘কিউআর কোড’ (QR Code) যুক্ত করা হবে। সাধারণ মানুষ নিজেদের স্মার্টফোন দিয়ে ওই কিউআর কোড স্ক্যান করলেই সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের মোট বরাদ্দ অর্থ, ব্যয়ের হিসাব, সংস্থার বিবরণী এবং কাজের লাইভ প্রোগ্রেস বা অগ্রগতি সম্পর্কে ঘরে বসেই বিস্তারিত জানতে পারবেন। এর জন্য গোটা রাজ্যজুড়ে একটি সুসংহত কেন্দ্রীয় ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার কাজও শুরু হয়েছে। এই সমস্ত নির্দেশ সঠিকভাবে রূপায়ণ করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলাশাসকদের (DM)। বিডিও, মহকুমাশাসক (SDO) এবং বিভিন্ন দপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের মাধ্যমে কড়া নজরদারি চালিয়ে এই নিয়ম কার্যকর করতে হবে। নবান্ন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নির্দেশ অমান্য করার মতো কোনো গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না।