‘রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলাকালীন কীভাবে ঘটল এই কাণ্ড?’ অসমে অয়েল ইন্ডিয়ার প্ল্যান্টে মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু

অসমের ডিব্রুগড় জেলার তেঙ্গাখাট এলাকায় অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেডের (Oil India) একটি শিল্পকেন্দ্রে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে দু’জনে দাঁড়িয়েছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় গুরুতর দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা আহতদের মধ্যে চারজনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক হওয়ায় তাঁদের বর্তমানে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হয়েছে। গত শুক্রবার সকালে এই মারাত্মক দুর্ঘটনাটি ঘটার পর থেকেই গোটা শিল্পাঞ্চল ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। কীভাবে এই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটল, তা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই সংস্থার পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ী অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেডের পক্ষ থেকে দেওয়া সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, গত শুক্রবার সকাল আনুমানিক ৯টা বেজে ৫ মিনিট নাগাদ তেঙ্গাখাটের ইন্টারমিডিয়েট ট্যাঙ্ক ফার্মের (ITF) ইনডাইরেক্ট বাথ হিটার বা আইডিবিএইচ (IDBH) এলাকায় হঠাৎই একটি তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে এবং সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং রহস্যজনক বিষয় হলো, দুর্ঘটনাস্থলটি সম্পূর্ণভাবে রক্ষণাবেক্ষণের কাজের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছিল এবং গত ৪ নভেম্বর থেকেই সেটি মূল উৎপাদন কার্যক্রম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা আইসোলেটেড অবস্থায় রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ, ওই নির্দিষ্ট অংশে কোনো ধরনের নিয়মিত উৎপাদন বা কার্যকম চলছিল না। তা সত্ত্বেও রক্ষণাবেক্ষণের মতো একটি সংবেদনশীল কাজের সময় কীভাবে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেল, তা নিয়ে বর্তমানে জোরালো প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন দু’জন দুর্ভাগ্যজনক কর্মী। এর আগে গত মঙ্গলবার এই বিস্ফোরণে প্রথম প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে রাজু দত্ত নামে এক কর্মী মারা যান। এরপর বুধবার ডিব্রুগড়ের একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে তপস জ্যোতি গগৈ নামক অপর এক গুরুতর দগ্ধ কর্মী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ও অক্লান্ত পরিশ্রম সত্ত্বেও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এছাড়া এই দুর্ঘটনায় দগ্ধ হওয়া বাকি পাঁচজন কর্মী এখনও একই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চারজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁদের ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রেখে কড়া চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
এদিকে দুর্ঘটনার আসল কারণ খুঁজে বের করতে এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে অয়েল ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংস্থার বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, এই কমিটি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের পেছনের তাত্ক্ষণিক এবং অন্তর্নিহিত কারণগুলি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করবে। পাশাপাশি এই দুর্ঘটনায় মোট কতখানি আর্থিক ও পরিকাঠামো গত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নও করবে এই কমিটি। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, কর্মীরা যখন রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছিলেন, ঠিক তখনই কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা দুর্ঘটনাজনিত কারণে বিস্ফোরণটি ঘটে এবং মুহূর্তের মধ্যে আগুন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। ইন্টারমিডিয়েট ট্যাঙ্ক ফার্ম মূলত এমন একটি সংবেদনশীল পরিকাঠামো, যেখানে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য পরবর্তী প্রক্রিয়াকরণ বা পরিবহণের আগে সাময়িকভাবে মজুত রাখা হয়। ফলে এই ধরনের জায়গায় সামান্য অসাবধানতাও যে মারাত্মক রূপ নিতে পারে, তা এই ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো। ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংস্থার নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ বিভাগের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দ্রুত তৎপরতার সঙ্গে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন, যা বড় ধরনের আরও বড় বিপর্যয় রোধ করেছে।