‘নেহরুর ভুলেই হাতছাড়া নোয়াখালি-চট্টগ্রাম!’ দেশভাগের পুরনো ক্ষত খুঁচিয়ে মেগা বোমা ফাটালেন বিজেপি সাংসদ

দীর্ঘদিন ধরেই পাক অধিকৃত কাশ্মীর বা PoK পুনরুদ্ধারের দাবি দেশের রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হয়ে আসছে। তবে এবার সেই চিরাচরিত সীমানা ছাড়িয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে একেবারে বিস্ফোরক দাবি তুললেন বিতর্কিত বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে। সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে দেওয়া এক চাঞ্চল্যকর সাক্ষাৎকারে তিনি শুধু পিওকে ফেরত চাওয়ার কথাই বলেননি, সেই দাবির সঙ্গে সরাসরি জুড়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের নোয়াখালি, সিলেট এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম বন্দরকেও। তাঁর এই বেনজির মন্তব্যের পর জাতীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে প্রবল শোরগোল ও কূটনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

সাক্ষাৎকারে নিশিকান্ত দুবে সরাসরি আঙুল তুলেছেন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর বিরুদ্ধে। তাঁর দাবি, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু সম্পূর্ণ জোর করে এবং একতরফাভাবে এই অঞ্চলগুলি পাকিস্তানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তাই বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ভারত সরকারের উচিত শুধুমাত্র পাক অধিকৃত কাশ্মীর পুনরুদ্ধারের দাবি সীমাবদ্ধ না রেখে, নেহরুর আমলে হাতছাড়া হওয়া সেই ঐতিহাসিক ভূখণ্ডগুলিও ফিরিয়ে আনার জোরদার দাবি তোলা। শুধু তাই নয়, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনেই তিনি দাবি করেন যে নোয়াখালি, সিলেট এবং চট্টগ্রাম বন্দর এককালে তৎকালীন ‘তিপ্রা রাজ্য’ বা আজকের ত্রিপুরার মূল ভূখণ্ডেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।

এই প্রসঙ্গে ত্রিপুরার তৎকালীন মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মানিক্যর ক্ষোভ ও প্রতিবাদের কথা তুলে ধরেন বিজেপি সাংসদ। নিশিকান্তের দাবি, দেশভাগের সময় ত্রিপুরার রাজা নেহরুর এই একতরফা সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। মহারাজা প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, তাঁর রাজ্যের ভূখণ্ড ও সীমানা নিয়ে অন্য কারও সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো অধিকার নেই। এমনকি নোয়াখালি পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়া এবং সিলেট ও চট্টগ্রামে গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও কঠোর আপত্তি জানিয়েছিলেন ত্রিপুরার রাজা। তৎকালীন শাসক চেয়েছিলেন যে তাঁর রাজ্য ভারতের অংশ হবে নাকি পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হবে কিংবা স্বাধীন থাকবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার একমাত্র তাঁর নিজেরই থাকা উচিত ছিল।

পাশাপাশি ১৯৪৬ সালের নোয়াখালির ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হিংসার প্রসঙ্গও তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন এই বিজেপি সাংসদ। তাঁর অভিযোগ, সেই সময় কংগ্রেস নেতৃত্বের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল অন্তর্বর্তী সরকারে মুসলিম লিগকে যেকোনো মূল্যে অন্তর্ভুক্ত করা। অথচ নোয়াখালিতে নিরীহ হিন্দুদের ওপর যখন পৈশাচিক হিংসার তাণ্ডব চলছে, তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফ থেকে পর্যাপ্ত বা কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। ১৯৪৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর নেহরু মুসলিম লিগকে সরকারে শামিল করার বিষয়েই বেশি ফোকাস করেছিলেন বলে তোপ দাগেন নিশিকান্ত।

নিশিকান্ত দুবের বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় দিকটি ছিল চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে। তাঁর যুক্তি, দেশভাগের সময় চট্টগ্রাম বন্দর ভারতের হাতছাড়া হওয়ার ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলির যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর মতে, চট্টগ্রাম বন্দর ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকলে উত্তর-পূর্ব ভারতের অফুরন্ত খনিজ সম্পদ, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং অন্যান্য বহুমুখী প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ও পূর্ণ ব্যবহার সুনিশ্চিত করা সম্ভব হতো। দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ওই অঞ্চলের মানুষকে যে ভৌগোলিক ও লজিস্টিক সমস্যার মুখে পড়তে হয়, চট্টগ্রাম বন্দর ভারতের হাতে থাকলে তা অনায়াসেই দূর করা যেত।

পরিশেষে সর্দার বল্লভভাই পটেলের দৃঢ় পদক্ষেপের কথা স্মরণ করে তিনি জানান যে, মহারানি কাঞ্চনপ্রভা দেবীর উদ্যোগ ও সেনার হস্তক্ষেপে ১৯৪৮ সালের অক্টোবর মাসে ত্রিপুরা আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু দেশভাগের সময় তৎকালীন রাজপরিবারের বৈধ দাবি ও আপত্তিগুলিকে কখনোই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পাক অধিকৃত কাশ্মীরের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের এই দাবি তুলে নিশিকান্ত দুবে যে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক উস্কে দিয়েছেন, তাতে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং দেশভাগের বিতর্কিত ইতিহাস নিয়ে আগামী দিনে কূটনৈতিক মহলে নতুন করে জোর চর্চা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।