দিল্লির দূষণ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের চরম অসন্তোষ! বারবার নিষেধাজ্ঞা কেন ‘ব্যর্থ হাতিয়ার’? জানুন আসল কারণ

দিল্লির বায়ুদূষণ মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবারের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ যানবাহন চলাচল এবং নির্মাণকাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির মতো গতানুগতিক পদক্ষেপগুলোকে “পুরনো, বারবার চেষ্টা করা এবং ব্যর্থ হওয়া হাতিয়ার” বলে তীব্র কটাক্ষ করেছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এ ধরনের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দিল্লির বিষাক্ত বাতাসের সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব নয়।
শুনানিপর্বে সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তীক্ষ্ণ প্রশ্ন তোলা হয়। প্রধান বিচারপতি জানতে চান, যানবাহন ও নির্মাণকাজ সাময়িক বন্ধ রাখা ছাড়া প্রশাসনের কাছে কি আর কোনো উন্নত বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নেই? বছরের পর বছর ধরে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা সত্ত্বেও কেন বায়ুর মান সূচক (AQI) সবসময় ৪০০-এর কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে? উৎসবের মরসুমে মানুষের বিভিন্নমুখী কর্মকাণ্ড দূষণ বাড়ালেও, তার সবটাই কি এই উপায়ে আটকানো সম্ভব?
কেন্দ্র ও কমিশন ফর এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্টের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ঐশ্বর্য ভাটি সাফাই দিয়ে জানান যে, জিআরএপি (GRAP)-এর মতো জরুরি পদক্ষেপগুলোকে পুরোপুরি ব্যর্থ বলা চলে না, কারণ এগুলো অন্তত দূষণের মাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট না হয়ে প্রধান বিচারপতি তৎক্ষণাৎ পাল্টা প্রশ্ন করেন, “তা সত্ত্বেও একিউআই তো চারশো ছুঁইছুঁই করছে!” বেঞ্চের অপর বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীও যোগ করেন যে, দিল্লিতে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত অধিকাংশ দিনই একিউআই ৩০০-এর ওপরে থাকে। পরিস্থিতি ‘খারাপ’ বা ‘অত্যন্ত খারাপ’ থেকে এখন যেন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে, অথচ আমাদের মূল নজর দেওয়া উচিত ‘গুরুতর’ পরিস্থিতির দিকে।
দিল্লির তীব্র যানজট এবং যানবাহনের ধোঁয়াকে দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আদালত। দিল্লি-গুরুগ্রাম, গাজিয়াবাদ এবং ফরিদাবাদ সংলগ্ন এলাকার রাস্তায় বাম্পার-টু-বাম্পার যানজট দেখে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, ভিনরাজ্য থেকে আসা গাড়িগুলো সামান্য সময় রাজধানীতে থাকলেও তা যথেষ্ট ক্ষতি করার পক্ষে যথেষ্ট। জ্বালানির মান বা গাড়ির অবস্থা সবসময় পর্যবেক্ষণ করা অসম্ভব হওয়ায় দিল্লি শহরটি যেন বর্তমানে একটি ‘ফ্রি ফর অল’ বা অবাধ বিচরণের জায়গায় পরিণত হয়েছে।
মাত্র তিন মাসের জন্য নন-বিএস৬ (Non-BS6) যানবাহন নিষিদ্ধ করা বা নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখার মতো সিদ্ধান্তগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি নীতি হিসেবে মানতে নারাজ আদালত। এগুলো কেবল শীতকালীন কিছু অস্থায়ী ব্যবস্থা। দিল্লির বাতাসে বিষের স্থায়ী নিরাময় ঘটাতে হলে বিজ্ঞানভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু পুরনো নিষেধাজ্ঞাগুলো বছরের পর বছর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রয়োগ করলে সমস্যার শেকড় পর্যন্ত পৌঁছানো যায় না।
শুনানি চলাকালীন দীপাবলি ও উৎসবের প্রসঙ্গও উঠে আসে। আদালত মনে করিয়ে দেয় যে, উৎসবের নামে অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ এবং উপহার আদান-প্রদানের সংস্কৃতিও রাস্তায় যানবাহনের চাপ বাড়িয়ে দূষণ বৃদ্ধিতে সমানভাবে ভূমিকা রাখছে। মানুষকে পুরনো ও সহজ ঐতিহ্যে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে আদালত জানিয়েছে, কেবল আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করে মানুষের আচরণ রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়; বরং যত বেশি আদেশ চাপানো হয়, ততই তা লঙ্ঘনের প্রবণতা বাড়ে।
বর্তমানে রাজধানীতে জিআরএপি-৩ (GRAP-3) পর্যায়ের কড়া নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। এর আওতায় নির্মাণকাজ স্থগিত রাখা, অফিসগুলোতে ৫০ শতাংশ উপস্থিতি এবং নানা ধরনের বিধিনিষেধ চালু আছে। তবে আদালতের মতে, এই পদক্ষেপগুলো কেবল আগুন লাগার পর নেভানোর মতো অবস্থা। আগুনের মূল উৎস চিরতরে নির্মূল করতে হলে অনেক বেশি গভীরে গিয়ে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা করতে হবে। যানবাহনের সংখ্যা কমানো, গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা, উন্নত মানের জ্বালানি ব্যবহার, শিল্পক্ষেত্রের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষিক্ষেত্রে খড় পোড়ানোর স্থায়ী সমাধান—এই বিষয়গুলোতে অবিলম্বে জোর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।