“জেলের অন্দরের প্রেম থেকে চেন্নাইয়ের অনুষ্ঠান!”-২০০ কোটি টাকার জালিয়াতি কাণ্ডে আদালতে কী বললেন নোরা?

সুকেশ চন্দ্রশেখরের ২০০ কোটি টাকার আর্থিক জালিয়াতির বহুল আলোচিত মামলায় আবারও শিরোনামে উঠে এলেন বলিউড অভিনেত্রী নোরা ফাতেহি। অতীতে সুকেশের কাছ থেকে বহুমূল্য উপহার ও নানা সুবিধা নেওয়ার গুরুতর অভিযোগে একাধিকবার কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়েছিল এই বিদেশি অভিনেত্রীকে। তবে এই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মাঝেই এবার মামলার তদন্তে মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে এক অভিনব পদক্ষেপ নিলেন নোরা। শুক্রবার দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউ আদালতে হাজির হয়ে সরকারি সাক্ষী হিসেবে নিজের গুরুত্বপূর্ণ জবানবন্দি রেকর্ড করালেন তিনি। এর আগে গত ২ নভেম্বর আদালতের সমন সত্ত্বেও পূর্বনির্ধারিত কাজের ব্যস্ততার কারণে তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি, যা নিয়ে বেশ কিছু জল্পনার সৃষ্টি হয়েছিল। অবশেষে সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে শুক্রবার তিনি নিজে আদালতে উপস্থিত হন এবং বিচারকের সামনে গোটা ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সুকেশ চন্দ্রশেখরের সঙ্গে কীভাবে তাঁর প্রথম পরিচয় হয়েছিল, চেন্নাইয়ের একটি বিলাসবহুল অনুষ্ঠানে তাঁর অংশগ্রহণ এবং সুকেশের স্ত্রী লীনা মারিয়া পলের সঙ্গে সাক্ষাতের সমস্ত নেপথ্য কাহিনী আদালতকে বিস্তারিতভাবে জানান নোরা। আদালতে দেওয়া নিজের বক্তব্যে অভিনেত্রী পরিষ্কার ভাষায় জানান যে, টি-সিরিজের দেওয়া বৈধ এমপ্লয়মেন্ট ভিসার মাধ্যমেই তিনি বর্তমানে ভারতে বসবাস করছেন এবং পেশাগত কাজেই তিনি চেন্নাইয়ের ওই ইভেন্টে অংশ নিয়েছিলেন। চেন্নাইয়ের ওই নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানটিতে যোগ দেওয়ার আগে ব্যক্তিগত স্তরে সুকেশ চন্দ্রশেখরকে তিনি বিন্দুমাত্র চিনতেন না। অভিযুক্ত সুকেশের স্ত্রী লীনা মারিয়া পলের মাধ্যমেই মূলত প্রথমবার সুকেশের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও যোগাযোগ ঘটেছিল।
তদন্তকারী সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে চেন্নাইয়ের একটি পাঁচতারা হোটেলে জাঁকজমকপূর্ণভাবে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিতে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন নোরা ফাতেহি। অনুষ্ঠানটির মূল আয়োজক ছিল সুকেশের স্ত্রী লীনা মারিয়া পল নিজেই। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার পাশাপাশি একটি জমকালো নাচের প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করা এবং বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের হাতে দাতব্য অর্থ তুলে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্বও পালন করেছিলেন অভিনেত্রী। কিন্তু পরবর্তীতে ২০০ কোটি টাকার আর্থিক দুর্নীতির কিংপিন হিসেবে সুকেশের নাম প্রকাশ্যে আসতেই নোরার সঙ্গে তাঁর বিলাসবহুল উপহার লেনদেনের বিষয়টি জাতীয় গণমাধ্যমে তীব্র আলোচনার ঝড় তোলে। ইডি ও দিল্লি পুলিশের স্ক্যানারে চলে আসেন একের পর এক তারকা।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের আগস্ট মাসে অভিযুক্ত সুকেশ চন্দ্রশেখরের নিজহাতে লেখা একটি চাঞ্চল্যকর চিঠি সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে ভাইরাল হয়েছিল। সেই চিঠিতে নোরাকে নিয়ে একাধিক বিস্ফোরক ও চাঞ্চল্যকর দাবি করেছিলেন সুকেশ। কুখ্যাত এই আর্থিক প্রতারকের দাবি ছিল, মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কায় একটি বাড়ি কেনার জন্য তিনি নাকি নোরা ফাতেহিকেই সরাসরি কয়েক কোটি টাকা দিয়েছিলেন। এছাড়াও নামী-দামি প্রসাধনী সামগ্রী, বিদেশি বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের হ্যান্ডব্যাগ এবং প্রিমিয়াম গাড়ি উপহার দেওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর তথ্যও সামনে এনেছিল সে। শুধু তাই নয়, নোরার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের গোপন স্ক্রিনশট ও চ্যাটের প্রসঙ্গও টেনে এনেছিল সুকেশ। তার দাবি ছিল, আরেক বলিউড অভিনেত্রী জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজের সঙ্গে সুকেশের পুরনো সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার জন্য নোরা নাকি তাকে ক্রমাগত প্ররোচিত করতেন এবং জ্যাকুলিনের প্রতি নোরা মারাত্মকভাবে ঈর্ষান্বিত ছিলেন। তবে আইনি মহলের মতে, এই সমস্ত দাবি একান্তভাবেই অভিযুক্ত সুকেশের নিজস্ব বক্তব্য, যার আইনি সত্যতা এখনও আদালতে প্রমাণিত নয়।
২০০ কোটি টাকার এই সুবিশাল আর্থিক কেলেঙ্কারির মামলায় এর আগে আরেক বলিউড সেনসেশন জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজের নামও একাধিকবার উঠে এসেছিল। নোরা এবং জ্যাকুলিন—উভয়কেই সুকেশের থেকে উপহার গ্রহণের অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন সময়ে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই মামলায় নোরা ফাতেহি কর্তৃক সরকারি সাক্ষী হিসেবে আদালতে নিজের জবানবন্দি রেকর্ড করার বিষয়টি গোটা বিচার প্রক্রিয়াকে এক সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। আদালতে নিজের বক্তব্যে নোরা মূলত সুকেশের সঙ্গে পরিচয়ের আসল উৎস এবং চেন্নাইয়ের সেই বিতর্কিত অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পেছনের সত্যতা তুলে ধরেছেন। মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় অভিনেত্রীর এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বয়ান আগামী দিনে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় রয়েছে গোটা দেশের আইনি মহল ও সাধারণ মানুষ।