সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ছায়া! বাম আমলের শিল্পনীতির দায় কি জ্যোতি বসুর ওপর? বিস্ফোরক বিমান বসু!

পশ্চিমবঙ্গে শিল্প ফেরানোর প্রতিশ্রুতি এবং শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের নয়া শিল্পনীতি ঘোষণার পরেই রাজ্য-রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন সমীকরণ। আধুনিক বঙ্গে জমি অধিগ্রহণই যে শিল্পের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, তা একবাক্যে স্বীকার করছে রাজনৈতিক মহল। ঠিক এমন এক উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবার বাম আমলের শিল্পনীতি এবং সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের বিতর্ক নিয়ে মুখ খুললেন সিপিএমের প্রবীণ নেতা বিমান বসু। তাঁর এই বিস্ফোরক বিশ্লেষণে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক চর্চা।

বিমান বসুর মন্তব্যে কোন ইঙ্গিত?

একটি সাক্ষাৎকারে বিমান বসু স্পষ্ট জানিয়েছেন, বামফ্রন্টের শিল্পনীতি তৈরি ও তা ঘোষণার মূল দায়িত্ব ছিল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর কাঁধে। পরবর্তীতে সেই নীতি কার্যকর করার দায়িত্ব পান বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। শিল্পনীতি নিয়ে অতীতে কোনো সমস্যা বা জটিলতা তৈরি হয়ে থাকলে, তার দায় সম্পূর্ণভাবে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বের উপরেই বর্তায় বলে মন্তব্য করেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই বিমান বসুর এই মন্তব্যের পর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে— তবে কি বাম আমলের শিল্পনীতি নিয়ে দলের অন্দরেই কোনো সুপ্ত অস্বস্তি রয়েছে?

বিশেষ করে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের ঐতিহাসিক জমি আন্দোলনের পর বাংলায় শিল্পায়নের পথ কতটা জটিল ও কণ্টকাকীর্ণ হয়ে উঠেছিল, তা আজও রাজ্যবাসীর স্মৃতিতে টাটকা। শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের পদ্ধতি, কৃষকদের সম্মতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত— প্রতিটি পদক্ষেপই নতুন করে ভাবিয়েছে বাংলাকে। সেই পুরনো ও সংবেদনশীল অধ্যায়ই এবার বিমান বসুর সৌজন্যে ফের উঠে এল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

মতপার্থক্যের জল্পনা উড়িয়ে দিলেন অসীম দাশগুপ্ত

যদিও বিমান বসুর এই মন্তব্যকে ঘিরে সিপিএমের অন্দরে জমি-নীতি নিয়ে মতবিরোধ বা দূরত্বের জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত। একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সমস্ত জল্পনায় জল ঢেলেছেন তিনি। অসীমবাবুর দাবি, শিল্পনীতি নিয়ে বামশিবিরে কখনোই কোনো মতপার্থক্য ছিল না। জ্যোতি বসুর আমল থেকেই সুদূরপ্রসারী ভাবনাচিন্তার মাধ্যমেই শিল্পায়ন ও কৃষির রূপরেখা তৈরি হয়েছিল।

একই সঙ্গে কৃষি ও শিল্পকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে, বরং হাত ধરાধরি করে পাশাপাশি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, প্রতিটি জেলার প্রকৃত চাহিদা ও ভূপ্রকৃতি বুঝে কৃষি ও শিল্পের সুষম পরিকল্পনা করাটাই ছিল বাম জমানার মূল লক্ষ্য।

কটাক্ষ করতে ছাড়েনি বিজেপি

বাম শিবিরের এই অভ্যন্তরীণ চর্চা এবং মতের অমিলকে লুফে নিতে দেরি করেনি রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। বিমান বসুর এই মন্তব্যকে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে ‘বিলম্বিত বোধোদয়’ বলে কটাক্ষ করেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর বিস্ফোরক মন্তব্য, “বাম জমানাতেই মূলত বাংলায় শিল্পবিরোধী পরিবেশ ও সংস্কৃতির বীজ রোপিত হয়েছিল। অতীতে আদিত্য বিড়লার মতো শিল্পপতিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং রাজ্যে কম্পিউটার চালুর তীব্র বিরোধিতা করেছিল এই বামেরাই।”

সমীকরণ এখন কোন দিকে?

নতুন শিল্পনীতি ঘোষণার আবহে রাজ্যজুড়ে যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই পুরোনো জমি বিতর্ক এবং অন্তর্দ্বন্দ্বের ছায়া ফের ঘনীভূত হলো। এখন রাজনৈতিক মহলের একটাই কৌতূহল— শিল্পের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সরকার কীভাবে জমি, কৃষক এবং প্রশাসনিক নীতির মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বা ‘ব্যালেন্স’ বজায় রাখে, সেটাই এখন দেখার বিষয়! সময়ের কষ্টিপাথরেই মিলবে সেই উত্তর।