দীপাবলি-ছটে বাড়ি ফেরার আকুতি নাকি অগ্নিপরীক্ষা? রেলের অব্যবস্থাপনায় লাখ লাখ মানুষের চোখের জল!

পরপ্রবাসে দিন কাটানো প্রতিটি মানুষের কাছে বছরভর ঘাম ঝরানোর পর দীপাবলি ও ছট পুজোর এই কটি দিন হলো জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়। বুকের গভীরে একটাই সুপ্ত বাসনা থাকে—নিজের বাড়িতে, মা-বাবার কাছে ফিরে যাওয়া। কিন্তু উৎসবের মরশুমে ভিনরাজ্য থেকে বিহার বা উত্তরপ্রদেশের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার এই যাত্রা কোনো রূপকথার আনন্দ নয়, বরং এক নির্মম অগ্নিপরীক্ষা। নতুন দিল্লি রেলওয়ে স্টেশনের বাইরে পা রাখতেই বোঝা যায়, লাখ লাখ মানুষের এই স্রোত কেবল বাড়ি ফেরার আকুতি নয়, বরং এক অসহনীয় অসহায়তার প্রতীক। কোলে আট মাসের দুধের শিশু আর হাতে সামান্য ব্যাগ নিয়ে যখন কেউ প্ল্যাটফর্মের দিকে এগোতে যান, তখন স্টেশনের উপচে পড়া ভিড় দেখে মনে হয় সমস্ত স্বপ্ন বুঝি এক নিমেষে ধুলিস্যাৎ হয়ে যাবে। ট্রেন মিস হওয়ার ভয়ে ঘড়ির কাঁটার দিকে চেয়ে বুক কেঁপে ওঠে, আর এই অন্ধকারের মাঝেও ৫০০ টাকার বিনিময়ে কোনো কুলির হাত ধরে ভিড় ঠেলে প্ল্যাটফর্মে পৌঁছানো যেন এক মায়ের বেঁচে থাকা আশার শেষ প্রদীপ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দুর্ভোগ কি কেবলই ক্ষণস্থায়ী? প্রতি বছর দীপাবলি ও ছট পুজো আসতেই এই চিত্র অত্যন্ত পরিচিত হয়ে ওঠে। ট্রেনগুলিতে সাধারণ কামরার যাত্রীদের যে অমানবিক লড়াই করতে হয়, তা দেখে যেকোনো সংবেদনশীল মানুষ শিউরে উঠবেন। দিল্লি-এনসিআরের বড় বড় স্টেশনগুলিতে অতিরিক্ত ভিড় সামাল দিতে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে প্ল্যাটফর্ম টিকিট বিক্রি পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হয়। ভারত আজ প্রযুক্তির চরম শিখরে পৌঁছে চাঁদে ও মঙ্গলে মহাকাশযান পাঠাচ্ছে, অথচ নিজের দেশের নাগরিকদের উৎসবের দিনে নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ন্যূনতম পরিকাঠামো আজও তৈরি করতে পারেনি। টিকিট কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইনের হতাশা, তৎকালের টিকিটের জন্য মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সব শেষ হয়ে যাওয়ার নাটক এবং দলাল ও বেআইনি সফটওয়্যারের রমরমা কারবার সাধারণ মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। একসময়ে যে রেল সাধারণ মানুষের ভরসা ছিল, আজ সেখানে নিশ্চিত টিকিট পাওয়া এক অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে, ট্রেন না পেয়ে মানুষ যখন বাধ্য হয়ে প্রাইভেট বাস কিংবা বিমানের শরণাপন্ন হয়, তখন সেখানে চলে আরেক দফা পকেট কাটার খেলা। যেখানে সাধারণ বাসভাড়া হাজার-বারোশো টাকা, সেখানে উৎসবের সুযোগে সেই ভাড়া চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। দিল্লি থেকে পাটনার বিমানভাড়া কুড়ি হাজার টাকা ছুঁয়ে ফেলে, অথচ দেশের একজন অমেধাবী বা অদক্ষ শ্রমিকের মাসিক আয় মোটে দশ হাজার টাকার আশেপাশে। তবে কি বছরভর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে এই দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখা মানুষগুলির নিজের পরিবারের সঙ্গে দুটো আনন্দ করার বা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের আশীর্বাদ নেওয়ার কোনো মৌলিক অধিকার নেই? সরকার স্পেশাল ট্রেন চালানোর কথা বললেও শেষ মুহূর্তে এই অপরিকল্পিত উদ্যোগ যাত্রীদের ভিড় কমাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। এসি কোচ বাড়ানোর প্রবণতা এবং সাধারণ ও স্লিপার কোচের অপ্রতুলতা প্রমাণ করে যে উৎসবের এই মরশুমের মার কেবল গরিব ও মধ্যবিত্তের ওপরই পড়ছে। এই সমস্যা শুধু একটি টিকিটের লড়াই নয়, এটি প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের আত্মসম্মান ও অধিকার রক্ষার লড়াই।