কাকার শ্রাদ্ধে যোগ দেওয়া অপরাধ! রাহুল গান্ধীর মেগা সমাবেশে অনুপস্থিত থাকায় কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত ১৫ বছরের পুরনো বিশ্বস্ত নেতা!

কংগ্রেসের যুব শাখা ‘ইন্ডিয়ান ইয়ুথ কংগ্রেস’-এর সাম্প্রতিক একটি কঠোর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র ঝড় ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সম্প্রতি দিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ‘ইন্ডি’ জোটের উদ্যোগে ভোট চুরির অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে এক বিশাল মেগা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশে উপস্থিত থাকতে না পারার অপরাধে মধ্যপ্রদেশের এক দীর্ঘদিনের নিষ্ঠাবান নেতাসহ দেশজুড়ে প্রায় দুশোর বেশি ইয়ুথ কংগ্রেসের নেতা-কর্মীকে দল থেকে একযোগে সস্পেন্ড বা বরখাস্ত করা হয়েছে। এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপের শিকার হওয়া বহিষ্কৃত নেতার নাম রোহিত রাজোরিয়া, যিনি দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দলের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। এমনকি অতীতে দলের বিভিন্ন আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক পুলিশি এফআইআর নথিভুক্ত হয়েছে এবং তাঁকে জেলযাত্রারও মুখোমুখি হতে হয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, রোহিত রাজোরিয়ার কাকা গত অক্টোবর মাসে মারা যান এবং ঠিক ১ নভেম্বর ছিল সেই কাকার নির্ধারিত শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। সেই দিন বাড়িতে আত্মীয়স্বজন ও অতিথিদের ব্যাপক সমাগম ছিল এবং পুরো পরিবার গভীর শোকের মধ্য দিয়ে দিনটি অতিবাহিত করছিল। রোহিত রাজোরিয়া পূর্বনির্ধারিত এই পারিবারিক বাধ্যবাধকতার কথা দলের রাজ্য সভাপতি সহ উচ্চপদস্থ সমস্ত নেতৃত্বকে আগেই লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন এবং ওই সমাবেশে অনুপস্থিত থাকার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন। এমনকী নিজের দাবির সত্যতা প্রমাণ করতে তিনি কাকার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্রও নেতাদের সামনে পেশ করেছিলেন। তা সত্ত্বেও দলীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে তাঁর আবেদন সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়। সবথেকে অবাক করার বিষয় হলো, তাঁকে কোনো ধরনের কারণ দর্শানোর বা শো-কজ নোটিশ পর্যন্ত না দিয়েই হঠাৎ করে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এই অমানবিক ও কঠোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে রোহিত জানিয়েছেন যে, পরিবারের এমন এক মর্মান্তিক ও সংকটজনক মুহূর্তে সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দলের এই শাস্তি পাওয়াটা অত্যন্ত অবিচারমূলক।
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পরই রাজনৈতিক মহলে এবং কংগ্রেসের অন্দরে তীব্র প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে যে, তবে কি কংগ্রেসে এখন গান্ধী পরিবারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য বা রাজনৈতিক উপস্থিতি পারিবারিক সামাজিক ও মানবিক দায়িত্বের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়ে গেছে? শৃঙ্খলার নামে যদি এমন চরম কড়াকড়ি চলে, তবে মাঠের সাধারণ কর্মীরা কীভাবে দলের প্রতি অনুপ্রাণিত থাকবেন, সেই প্রশ্নও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। জানা গেছে, মধ্যপ্রদেশে কেবল রোহিত একাই নন, এমন প্রায় ৬০ জনের বিরুদ্ধে একযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া অন্যান্য নেতারাও তাঁদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিভিন্ন বৈধ সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন—কারও ভাইয়ের সন্তানের জন্ম তো কারও পরিবারের জরুরি চিকিৎসাজনিত বা সামাজিক কাজ ছিল। কিন্তু দলের তরফ থেকে কাউকেই কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, ইয়ুথ কংগ্রেসের জাতীয় নেতৃত্ব এই কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গেয়ে জানিয়েছে যে, সংগঠনের অভ্যন্তরে কড়া শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে চলমান এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক আন্দোলনে সমস্ত নেতার সক্রিয় অংশগ্রহণ একান্ত বাধ্যতামূলক, ফলে অনুপস্থিতি মানেই সরাসরি দায়িত্বে অবহেলা। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দলীয় শৃঙ্খলার অজুহাতে কর্মীদের পারিবারিক মানবিক বিপর্যয় ও শোকের সময় এ ধরনের কঠোরতা দলের সামগ্রিক জনকল্যাণমুখী ও মানবিক ভাবমূর্তিকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ইতিমধ্যে শাসক দল বিজেপি সহ বিরোধীরা এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ স্বৈরাচার ও ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে। তাঁদের মতে, কংগ্রেসে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে সাধারণ মানুষের মৌলিক পারিবারিক কর্তব্যকেও তুচ্ছ জ্ঞান করা হয়। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে দলের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করা রোহিত রাজোরিয়ার মতো নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের এমন অপমানজনক শাস্তি দলের অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে আরও বিষাক্ত করে তুলতে পারে এবং ভবিষ্যতে দলের স্বতঃস্ফূর্ত কর্মী বাহিনীতে মারাত্মক হতাশা ডেকে আনতে পারে।