৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে রণক্ষেত্র ঢাকা-গাজীপুর! পেটের দায়ে রাজপথে নেমে এল লাখ লাখ পোশাক শ্রমিক

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি আর পেটের দায়ে ফের রাজপথে নেমে আন্দোলনে ফেটে পড়েছেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানার লাখ লাখ শ্রমিক। ন্যূনতম মজুরি দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে চলা ক্ষোভ সোমবার কার্যত এক বিশাল গণবিস্ফোরণে রূপ নেয়। রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশের সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া এবং মিরপুরের মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ বন্ধ করে রাস্তায় নেমে আসায় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক অবরোধ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ, টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ এবং পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে স্তব্ধ হয়ে পড়ে যান চলাচল। আন্দোলনরত শ্রমিকদের হটাতে পুলিশ মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামান ও লাঠিচার্জ চালায়, যার ফলে বহু শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন।
সারা বিশ্বে তৈরি পোশাক রফতানিতে চীনের পরেই দ্বিতীয় স্থানে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এই পোশাক শিল্প। বিশ্বের নামীদামি সব আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরি হয় এখানকার কারখানাগুলোতে, যা দেশের সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেয়। অথচ সেই কারখানার ঘাম ঝরানো শ্রমিকদের আক্ষেপ, মালিকপক্ষ বিপুল মুনাফা লুটলেও তাঁদের ভাগ্যে জোটে কেবল নামমাত্র মজুরি। বর্তমান ভয়াবহ উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির বাজারে এই সামান্য আয়ে পরিবারের দু’বেলা অন্নসংস্থান করাও সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে উঠেছে। তাই বর্তমান বেতন কাঠামো ভেঙে ন্যূনতম মাসিক মজুরি অন্তত ৩০ হাজার টাকা করার অনড় দাবিতে রাজপথে নেমেছেন তাঁরা। গাজীপুরে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করার পাশাপাশি বেশ কিছু গাড়িতে ভাঙচুর চালান। মিরপুর ও আশুলিয়াতেও একযোগে নেমে তীব্র প্রতিবাদ জানান তাঁরা।
এদিকে শ্রমিক অসন্তোষের মুখে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিলেও আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ এতটুকু প্রশমিত হয়নি। শ্রমিক নেতাদের স্পষ্ট বক্তব্য, কেবল আশ্বাসের বোর্ড গঠন করে সময়ক্ষেপণ করলে চলবে না, বাজারের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবিলম্বে সম্মানজনক মজুরি কার্যকর করতে হবে। শ্রমিকদের এই ন্যায্য দাবির ওপর রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ ও দমন-পীড়নের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে দেশের বামপন্থী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পক্ষ থেকে আন্দোলনরত শ্রমিক ও নেতাদের গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও পুলিশি নির্যাতনের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, ছাঁটাই বন্ধ এবং ন্যূনতম মজুরি ৩৭ হাজার ১২৫ টাকা নির্ধারণের জোরালো দাবি তোলা হয়েছে।
একই সুর শোনা গেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) গলাতেও। আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়ে রাজধানীর পল্টন মোড়ে এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে দলটি। সিপিবির নেতৃবৃন্দ বলেন, যাঁদের শ্রমে দেশের অর্থনীতি সচল, তাঁদের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো ন্যূনতম মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা কোনোভাবেই অপরাধ হতে পারে না। একদিকে মজুরি বোর্ড গঠনের আশ্বাস আর অন্যদিকে রাজপথে লাঠি-গুলি চালানো সরকারের চরম দ্বিচারিতা। সভা শেষে পল্টন এলাকায় একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিলের মাধ্যমে অবিলম্বে গ্রেপ্তারকৃত শ্রমিকদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং ত্রিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের কড়া বার্তা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে, সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত কার্যকর ও সম্মানজনক পদক্ষেপ না এলে এই আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করার জোরালো ইঙ্গিত মিলছে।