লাল-হলুদ রঙে রাঙা সরকারি ভবন আর আধুনিক সিসি ক্যামেরায় মুড়ে ফেলা হচ্ছে কোচবিহারকে! কী এমন মাস্টারপ্ল্যান?

ব্রিটিশ আমলের ইংল্যান্ডের নগর পরিকল্পনা মাথায় রেখে কোচবিহার শহরকে একসময়ে অত্যন্ত সুচারুভাবে গড়ে তুলেছিলেন কোচ মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ। ভারতবর্ষের হাতে গোনা কয়েকটি পরিকল্পিত ঐতিহাসিক শহরের মধ্যে কোচবিহার অন্যতম। সেই রাজরাজাদের হাতে গড়া ঐতিহ্যবাহী শহরটিকে এবার ঢেলে সাজিয়ে পূর্ণাঙ্গ ‘হেরিটেজ শহরে’ পরিণত করার এক মেগা উদ্যোগ গ্রহণ করল উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতর।

দুর্গাপুজোর পরে রাস উৎসবই কোচবিহারের সবচেয়ে বড় ও জমজমাট উৎসব। মদনমোহন মন্দিরের এই বিখ্যাত রাস উৎসব দেখতে দূরদূরান্ত থেকে শুধু দেশ নয়, বিদেশ থেকেও অগণিত মানুষ ভিড় জমান। আসছে রাস উৎসব, আর তার আগেই পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের এক অনন্য অভিজ্ঞতা দিতে শহরের সৌন্দর্যায়নে কোমর বেঁধে নেমেছে প্রশাসন।

লাল-হলুদ ঐতিহ্য ও হেরিটেজ ক্লক টাওয়ার: ঐতিহ্য এবং ইতিহাসকে হাত ধراطরি করে এগিয়ে নিয়ে যেতে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতর একাধিক সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ করেছে। সম্প্রতি অতীতের নীল-সাদা রঙ সরিয়ে কোচবিহারের চিরাচরিত লাল-হলুদ ঐতিহ্যের রঙে রাঙিয়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন সরকারি ভবন। উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক জানিয়েছেন, এই কাজ আগামী দিনে আরও ব্যাপক আকারে করা হবে।

শহরের হরিশপাল মোড়ে যে আইকনিক ক্লক টাওয়ারটি রয়েছে, যা বর্তমানে অধিকাংশ সময়েই অকেজো বা বন্ধ থাকে, সেটি ভেঙে ফেলে রাজ-ঐতিহ্যের সঙ্গে মানানসই এক সুদর্শন হেরিটেজ ডিজাইনের ক্লক টাওয়ার পুনর্নির্মাণ করা হবে। এই কাজের জন্য অর্থের কোনো অভাব হবে না বলে আশ্বাস দিয়ে মন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রয়োজনে আরও তহবিল বরাদ্দ করা হবে।

রেপ্লিকা ও আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যালিংয়ের চমক: কোচবিহারের প্রধান ট্রাফিক পয়েন্ট ও মোড়গুলিকে সাজিয়ে তুলতে নেওয়া হয়েছে অভিনব সব পরিকল্পনা:

  • স্টেশন মোড় ও অন্যান্য পয়েন্ট: শহরের প্রায় ৪০টি ট্রাফিক পয়েন্ট সাজাতে কোথাও রাখা হবে হেরিটেজ দোতলা বাসের (NBSTC) রেপ্লিকা, কোথাও থাকবে কোচবিহারের প্রথম বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের রেপ্লিকা এবং পরবর্তীতে আসা ডিজেল ইঞ্জিনের অবয়ব।

  • রাজবাড়ির আদল ও বিমান: শহরের ডিভাইডারগুলো সাজানো হবে কোচবিহার রাজবাড়ির আদলে। রেলগুমটি মোড়ে বসানো হবে একটি অত্যাধুনিক এরোপ্লেনের রেপ্লিকা। এছাড়া মিনি বাসস্ট্যান্ড চত্বরেও একটি দোতলা বাসের রেপ্লিকা তৈরি হবে। এই সমস্ত রেপ্লিকা ফাইবার রিইনফোর্সড প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে।

  • জেনকিন্স স্কুল মোড় ও মদনমোহন বাড়ি: এই গুরুত্বপূর্ণ চত্বরগুলি নতুন করে সাজানোর পাশাপাশি শহরের রাস্তাগুলিতে বসানো হবে অত্যাধুনিক আলোকসজ্জা।

নিরাপত্তা ও আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা: শহরের অধিকাংশ ট্রাফিক পয়েন্টেই দীর্ঘদিন ধরে সঠিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা না থাকায় প্রায়শই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটে। এই সমস্যা দূর করতে ৪০টি ট্রাফিক পয়েন্টকে সম্পূর্ণ আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে। পাশাপাশি, উচ্চ রেজোলিউশনের সিসি ক্যামেরার কভারেজে মুড়ে ফেলা হবে পুরো শহরকে, যা জনজীবনের নিরাপত্তাকে আরও জোরদার করবে। এই সমস্ত প্রাথমিক কাজের জন্য আড়াই কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

আসন্ন রাসমেলা শুরু হওয়ার আগেই যাতে এই সৌন্দর্যায়নের কাজ সম্পূর্ণ হয়, তার জন্য কলকাতা থেকে বিশেষ শিল্পী ও এজেন্সির টিম এনে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতর। রাজ-ঐতিহ্যের এই রূপান্তর কোচবিহারকে পর্যটনের মানচিত্রে আরও উঁচুতে নিয়ে যাবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।