নবান্নের নতুন কড়াকড়িতে বিপাকে উত্তর কলকাতার বিখ্যাত দত্ত বাড়ি! কালীপুজোয় কি আকাশে উড়বে না ফানুস?

ফানুসের সঙ্গে বাঙালির আবেগ ও নস্ট্যালজিয়ার সম্পর্ক সুপ্রাচীন। আজকের আধুনিক ব্যস্ততার যুগেও বহু পুরনো ঐতিহ্য আজও সযত্নে লালন করে চলেছে কলকাতার কিছু বনেদি পরিবার। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৯১২ সালে উত্তর কলকাতার বিডন স্ট্রিটের দর্জি পাড়ায় বাবু সংস্কৃতির স্বর্ণযুগে প্রথম ফানুস ওড়ানোর চল শুরু হয়েছিল। তৎকালীন স্কটিশ চার্চ কলেজের গণিতের অধ্যাপক গৌরীশঙ্কর দে মহাশয় প্রথম কলকাতার আকাশে ফানুস উড়িয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আর সেই ঘটনার পর থেকেই উত্তর কলকাতার বিডন স্ট্রিটের বিখ্যাত দত্ত বাড়ি বা ভোলানাথ ধামের নাম ফানুস সংস্কৃতির সমার্থক হয়ে ওঠে।

১৯২৫ সালে প্রথমবার বিডন স্ট্রিটের এই দত্ত বাড়ির আঙিনা থেকে ফানুস ওড়ানো হয়েছিল। সেই থেকে শুরু হওয়া প্রথা আজও অবিকৃত রয়েছে। দেখতে দেখতে এ বছর ১০২ বছরে পা রাখতে চলেছে উত্তর কলকাতার এই ঐতিহাসিক দত্ত বাড়ির ফানুস ওড়ানোর গৌরবোজ্জ্বল রীতি। কিন্তু শতবর্ষ পার করা এই প্রাচীন ঐতিহ্য কি এবার আইনি জটিলতা এবং প্রশাসনিক কড়াকড়ির কোপে পড়তে চলেছে? সম্প্রতি রাজ্য সরকারের নবান্নের পক্ষ থেকে একটি প্রেস কনফারেন্সে স্পষ্ট নির্দেশিকা জারি করে জানানো হয়েছে যে, দীপাবলি বা কালীপুজোয় ফানুস ওড়ানোর ক্ষেত্রে এবার থেকে প্রশাসনের পূর্বানুমতি বা পারমিশন বাধ্যতামূলক। এই নতুন নিয়মের বেড়াজালেই এখন বড়সড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়েছে দত্ত বাড়ির শতাব্দীপ্রাচীন উৎসব।

পরিবারের অন্যতম সদস্য অজয় দত্ত সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, তাঁদের এই ঐতিহ্যবাহী রীতি এবছর ১০২তম বর্ষে পদার্পণ করছে। এবছরের ফানুসের বিশেষ থিম হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে বাংলার লুপ্তপ্রায় ব্রতকথাগুলিকে। আজকের প্রজন্ম বা ইয়ং জেনারেশনের অনেকেই বাংলার এই প্রাচীন লোকসংস্কৃতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়, তাই নতুন প্রজন্মকে শিকড়ের সন্ধান দিতেই এই অভিনব ভাবনা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসনের অনুমতি না মিললে ঐতিহ্যশালী এই ফানুস আকাশে উড়বে কী করে? এই বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া মেনে লালবাজার এবং দমকল দফতরেও যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিল পরিবার। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দমকল দফতরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট আধিকারিককে উপস্থিত না পাওয়ায় দেখা করা সম্ভব হয়নি।

তবে এতকিছুর পরেও রাজ্য সরকারের সদিচ্ছা ও সহযোগিতার ওপর সম্পূর্ণ ভরসা রাখছেন দত্ত বাড়ির সদস্যরা। অজয় দত্ত আশাপ্রকাশ করে বলেছেন যে, তাঁরা আশা করছেন সরকারের কাছ থেকে যথাযথ সাহায্য মিলবে এবং পারমিশন পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বড় সমস্যা হবে না। প্রতি বছর কালীপুজোর পবিত্র সন্ধ্যায় শতাব্দীপ্রাচীন এই ফানুস ওড়ানোর জাঁকজমকপূর্ণ মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে দত্ত বাড়ির দালানে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। অতীতে মার্ভেল ইউনিভার্সের ক্যাপ্টেন আমেরিকার শিল্ড, অপারেশন সিঁদুর কিংবা জনপ্রিয় গেম ‘অ্যাঙ্গরি বার্ডস’-এর মতো আধুনিক বিষয়ের পাশাপাশি বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্য ও শিল্পকলাও দত্ত বাড়ির ফানুসের গায়ে নিখুঁত সুনিপুণ শিল্পে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এবছরও তার কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না বলেই তাদের বিশ্বাস। সমস্ত প্রশাসনিক জটিলতা ও পারমিশনের গেরো পেরিয়ে রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় দত্ত বাড়ির ছাদ থেকে হাজারো আলোর উৎসবে ভেসে আকাশ ছোঁবে ঐতিহ্যের ফানুস—এমনটাই প্রত্যাশা সমগ্র উত্তর কলকাতার।