“নেতাজিকে নিয়ে এই তুচ্ছতাচ্ছিল্য বরদাস্ত নয়!” প্রভাসের নতুন ছবি বয়কটের ডাক দিয়ে কড়া চিঠি চন্দ্র কুমার বসুর!

দক্ষিণী সুপারস্টার প্রভাস অভিনীত আসন্ন বহুল প্রতীক্ষিত ছবি ‘ফৌজি’ (Fauzi) ঘিরে মুক্তির শুরু থেকেই দানা বেঁধেছে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক। ছবির টিজার প্রকাশ্যে আসতেই তা নিয়ে শুরু হয়েছে সমালোচনার ঝড়। ছবিটিতে ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে বলে সরাসরি গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভারতের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা বিপ্লবী নেতা সুভাষচন্দ্র বসুর প্রপৌত্র, বিশিষ্ট সমাজ-রাজনৈতিক কর্মী এবং বিজেপির প্রাক্তন সহ-সভাপতি চন্দ্র কুমার বসু। তিনি কেবল এই টিজারটি অবিলম্বে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সরিয়ে নেওয়ার জোরালো দাবিই তোলেননি, পাশাপাশি দেশের কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের কাছে একটি কড়া ভাষায় চিঠি লিখে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও জোরালো আর্জি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি পরিচালক হনু রাঘবপুদিকে বিষয়টির সংবেদনশীলতা ও গাম্ভীর্য অনুধাবন করার আহ্বান জানিয়েছেন।

গত মঙ্গলবার চন্দ্র কুমার বসু তাঁর অফিসিয়াল এক্স (X) হ্যান্ডেলে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর উদ্দেশ্যে লেখা তাঁর সেই বিতর্কিত চিঠিটি সর্বসমক্ষে শেয়ার করেন। চিঠিতে তিনি তীব্র ক্ষোভপ্রকাশ করে উল্লেখ করেন যে, ছবির এই টিজারটি গত ২৩ অক্টোবর মুক্তি পেয়েছিল—যে দিনটি ছিল মহান বিপ্লবী নেতা ভগবতী চরণ পাণিগ্রাহীর ৮৩তম ‘বলিদান দিবস’। উল্লেখ্য, ভগবতী চরণ পাণিগ্রাহি ছিলেন স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর এক অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী। টিজারটিতে নেতাজির ঐতিহাসিক চরিত্রটিকে নাৎসি জার্মানির একনায়ক অ্যাডলফ হিটলারের মুখোমুখি বসিয়ে কথোপকথন করতে এবং ‘ফৌজি’ নামের একটি কাল্পনিক চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় করাতেন দেখানোর কারণেই মূল আপত্তি জানিয়েছেন চন্দ্র কুমার বসু।

চিঠিতে সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “নেতাজির মতো মহান জাতীয় নায়ককে নিয়ে এই ধরনের তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ ও মনগড়া আচরণে আমরা দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে অত্যন্ত মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ। সেন্সর বোর্ডের মতো একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান কীভাবে এমন আপত্তিকর এবং ঐতিহাসিক তথ্য বিকৃত করা বিষয়বস্তুকে ছাড়পত্র দিল, তা আমাদের সাধারণ বুদ্ধির সম্পূর্ণ অতীত। আপনাদের কাছে আমাদের বিনীত ও জোরালো অনুরোধ, এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুতর বিষয়টি অবিলম্বে খতিয়ে দেখে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করুন। যদি এই আপত্তিকর টিজারটি ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়া থেকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে ফেলা হয় এবং এর জন্য সেন্সর বোর্ডের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়, তবেই তা হবে জাতির প্রকৃত সেবা।”

শুধু তাই নয়, এই একই ইস্যুতে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রে মোদিকে ট্যাগ করে চন্দ্র কুমার বসু সোশ্যাল মিডিয়ায় আরও লেখেন, “‘ফৌজি’ সিনেমার এই বিতর্কিত টিজারটি অবিলম্বে সরিয়ে ফেলা উচিত, সমস্ত অসঙ্গতি সংশোধন করা উচিত এবং তারপরেই তা পুনরায় জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে আমাদের এই গভীর উদ্বেগ ও আপত্তি যদি নির্মাতারা সময়মতো নিরসন করেন, তবে অভিনেতা প্রভাস এবং পরিচালক সহ ‘@FauziTheMovie’-এর পুরো টিমের ভবিষ্যৎ কাজের জন্য আমার আন্তরিক শুভকামনা রইল। আশা করি, বর্তমান প্রজন্ম ও দেশের ইতিহাস নিয়ে এই বিষয়টি কতটা গুরুতর ও সংবেদনশীল, তা তাঁরা উপলব্ধি করতে পারবেন।”

প্রসঙ্গত, গত ২৩ অক্টোবর অভিনেতা প্রভাসের ৪৭তম জন্মদিনের বিশেষ শুভলগ্নে ‘ফৌজি’ ছবির নির্মাতারা ‘ফাইল নং ২৫’ (File No. 25) শিরোনামে একটি ১ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের ভিডিয়ো ক্লিপ প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে প্রভাসের রূপদানের প্রথম ঝলক সামনে আসে। ১৯৪২ সালের উত্তাল বার্লিনের পটভূমিতে তৈরি এই ভিডিও ক্লিপটিতে দেখানো হয়েছে যে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ভারতকে স্বাধীন করার উদ্দেশ্যে সুভাষচন্দ্র বসু জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাডলফ হিটলারের কাছে সামরিক সহায়তা প্রার্থনা করছেন। ঠিক সেই সময়েই হিটলার যখন তাচ্ছিল্যের সুরে মন্তব্য করেন যে ভারতীয়রা জন্মগতভাবেই শাসিত হতে অভ্যস্ত, তখন বোস তাঁর প্রত্যুত্তরে এমন এক কাল্পনিক ভারতীয় গুপ্তচরের কথা তুলে ধরেন যিনি পরবর্তীতে জাপানকে ব্রিটিশদের শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করতে এবং সিঙ্গাপুরের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে তুলে নিতে সাহায্য করেছিলেন।

ভিডিওটিতে আরও দেখানো হয় যে, ওই রহস্যময় গুপ্তচর পবিত্র ভগবদ্গীতা থেকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে একটি সম্পূর্ণ গোপন সংকেত ব্যবস্থা বা সিক্রেট কোড ডিজাইন করেছিলেন এবং বর্তমানে তিনি নাকি খাস কলকাতায় আত্মগোপন করে রয়েছেন। তবে এই প্রমোশনাল ভিডিয়োটির একেবারে শেষাংশে অগোছালো ও রাফ অ্যান্ড টাফ চেহারার প্রভাসকে ধূমপান করতে এবং একটি বিশাল আধুনিক বন্দুক দিয়ে রহস্যময় কোনো লক্ষ্যের দিকে এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়তে দেখা যায়। মূলত টিজারটির একটি বিশেষ দৃশ্যে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নেতাজি ও হিটলারকে প্রভাসের মতো ফিকশনাল বা কাল্পনিক চরিত্রের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতে দেখানোর জন্যই চলচ্চিত্র সমালোচক এবং ইতিহাসবিদদের একাংশ থেকে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

উল্লেখ্য, প্রতিভাবান পরিচালক হনু রাঘবপুদি পরিচালিত মেগা বাজেটের এই ঐতিহাসিক অ্যাকশন ড্রামা ছবিটি প্রযোজনা করেছে দক্ষিণ ভারতের খ্যাতনামা প্রোডাকশন হাউস ‘মাইথ্রি মুভি মেকার্স’ এবং এর পরিবেশনার দায়িত্বে রয়েছে জনপ্রিয় প্রযোজনা সংস্থা ‘টি-সিরিজ ফিল্মস’। ছবিটির মূল প্রযোজকের দায়িত্বে রয়েছেন নবীন ইয়েরনেনি, ওয়াই রবি শঙ্কর এবং ভূষণ কুমার। প্রাথমিক শিডিউল অনুযায়ী আগামী ২০২৭ সালের ১৯ মার্চ বড় পর্দায় মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে প্রভাসের এই বহুল আলোচিত ছবিটির। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক এবং বয়কটের হুঙ্কারের মুখে দাঁড়িয়ে ছবির প্রযোজক ও পরিচালক আগামী দিনে কী ধরনের আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং দর্শকদের মন জয় করতে আদৌ ছবির চিত্রনাট্যে কোনো পরিবর্তন আনেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।