‘মেরুদণ্ড সোজা রেখে কাজ করুন, না পারলে পদ ছাড়ুন!’ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হুঙ্কারে নড়েচড়ে বসল স্বাস্থ্যমহল!

রাজ্যের সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। স্বাস্থ্য ভবনে সমস্ত মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার খতিয়ান তুলে ধরে বেশ কিছু কড়া পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছেন তিনি। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘোষণাটি হল— আগামী বছর থেকে রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে দুর্গাপুজোর ষষ্ঠী থেকে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো পর্যন্ত টানা ছুটির প্রচলিত প্রথার অবসান ঘটতে চলেছে।
কী জানালেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী? বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, স্বাস্থ্যকর্মীরা সরাসরি জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। তাই অন্যান্য সাধারণ সরকারি দফতরের কর্মীদের মতো দীর্ঘ ছুটির সুযোগ তাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না। তাঁর দাবি, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই রাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পুজো উপলক্ষে কার্যত ছুটির আমেজ চলে আসছে। আগামী বছর থেকে সেই প্রথা আর চলতে দেওয়া হবে না।
এর বিকল্প হিসেবে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমী— এই চার দিন বিশেষ ডিউটি রোস্টার চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরেও বহু চিকিৎসক, শিক্ষক, অধ্যক্ষ, মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্ট কাম ভাইস প্রিন্সিপাল (এমএসভিপি), নন-মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্ট এবং সাফাইকর্মীদের ছুটির মাঝেই কাজে ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
নন-মেডিক্যাল কর্মীদের জন্য বিশেষ রোস্টার: চলতি বছর থেকে চালু হওয়া চার দিনের এই বিশেষ ডিউটি রোস্টার আগামী বছরও কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নন-মেডিক্যাল কর্মীদের প্রায় ৫০ শতাংশকে সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত পালা করে ডিউটিতে রাখা হচ্ছে। তবে চিকিৎসক ও নার্সদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো উৎসবকালীন রোস্টার থাকছে না; হাসপাতালের জরুরি প্রয়োজন এবং রোগীর স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই তাঁদের ডিউটি করতে হবে।
প্রশাসনের কর্তাদের প্রতি কড়া বার্তা: নিজের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কর্তাদের আরও বেশি দৃঢ় ও আপসহীন থাকার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। প্রশাসনিক বৈঠকে তিনি কড়া সুরে বলেন, যাঁরা ‘মেরুদণ্ড সোজা রেখে’ নিজেদের কাজটুকু করতে পারবেন না, তাঁদের পদে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।
চিকিৎসক মহলে বিতর্ক ও প্রতিক্রিয়া: স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই চিকিৎসক মহলের একাংশের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। মন্ত্রীর বলা ‘মেরুদণ্ড সোজা রেখে কাজ করার’ অর্থ আসলে কী— তা নিয়ে শুরু হয়েছে তরজা। এটি কি সরকারের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার বার্তা, নাকি প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান— তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। পাশাপাশি, সরকারি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজগুলিতে এখনও কোনো ধরনের ভয়ের পরিবেশ বা সংস্কৃতি বজায় রয়েছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকদের একাংশ। সব মিলিয়ে, পুজোর দীর্ঘ ছুটি বাতিলের পাশাপাশি স্বাস্থ্য দপ্তরের এই নতুন নীতি এবং হাসপাতালের অন্দরের কর্মপরিবেশ এখন রাজ্যের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।