“সবাই সাংবাদিক নন!” সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার ও গণমাধ্যম নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের কড়া পর্যবেক্ষণে তোলপাড়!

যে কেউ নিজেকে সাংবাদিক বলে দাবি করলেই তাঁকে প্রাতিষ্ঠানিক বা স্বীকৃত (Accredited) সাংবাদিকদের মতো সমান সুরক্ষা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। দেশে সংবিধানপ্রদত্ত প্রতিটি নাগরিকের মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে, তবে সকলেই যদি সাংবাদিক হয়ে ওঠেন, তবে পেশার মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাই সাংবাদিকদের সঠিক পরিচয় এবং তাঁদের কাজের ধরন বা পরিধি নিয়ে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকা একান্ত প্রয়োজন। সম্প্রতি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি ও ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে চলা প্রতিবাদ আন্দোলনে কতিপয় সংবাদকর্মীর নিগ্রহ সংক্রান্ত একটি চাঞ্চল্যকর মামলার শুনানি চলাকালীন এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ পেশ করেছে দেশের শীর্ষ আদালত।
প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গত ১০ অক্টোবর দিল্লির বুকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি এবং এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে একাধিক সাংবাদিক ও চিত্রসাংবাদিক পুলিশের হাতে বেধড়ক হেনস্থার শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে। নিগৃহীতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মহিলা সাংবাদিকও ছিলেন। এই ঘটনার পরই আইনি লড়াই শুরু হয়। শুক্রবার মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে জানায় যে, বর্তমান যুগে অনেকেই বাক স্বাধীনতার অধিকারকে হাতিয়ার করে নিজেদের সাংবাদিক বলে পরিচয় দিচ্ছেন। কিন্তু মূলধারার স্বীকৃত সংবাদমাধ্যমে কর্মরত পেশাদার সাংবাদিক এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় খবর বা ভিডিও তৈরি করা কনটেন্ট নির্মাতাদের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ করা সব সময় সহজ হয় না। আদালতের দ্ব্যর্থহীন অভিমত, বর্তমান সামাজিক ও ডিজিটাল পরিস্থিতিতে পেশাদার সাংবাদিকদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি অত্যন্ত জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই প্রথাগত সাংবাদিক, ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের কাজের পরিধি ও পরিচয়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট রেখা টানা প্রয়োজন, যা নিয়ে ভবিষ্যতে গভীরভাবে ভাবনাচিন্তা করা যেতে পারে।
এদিনের শুনানিতে আবেদনকারীদের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন দেশের প্রবীণ আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং। তিনি সাংবাদিকদের কাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় প্রোটোকল তৈরির জোরালো দাবি জানান। এই মামলার শুনানিতে আরও একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। জানা গিয়েছে, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় এক মহিলা সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশের এক পদস্থ আধিকারিক পালটা মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ ছিল, ওই সাংবাদিক ও তাঁর সহযোগীরা কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারকে লক্ষ্য করে জাতপাত তুলে কটূক্তি করেছেন। অন্যদিকে, পাল্টা অভিযোগে ওই মহিলা সাংবাদিক দাবি করেন যে, বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করার সময় তিনি দিল্লি পুলিশের একাংশের হাতে যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছেন। এই দুই পক্ষের অভিযোগে গোটা দেশজুড়ে বর্তমানে চরম চর্চা ও রাজনৈতিক শোরগোল শুরু হয়েছে।
এই হাই-প্রোফাইল মামলার প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট এদিন স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওই মহিলা সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এখনই কোনো ধরনের কঠোর বা coercive পদক্ষেপ করতে পারবে না দিল্লি পুলিশ। পাশাপাশি, পেশাদার সাংবাদিকদের সাংবিধানিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার বিষয়ে দায়ের হওয়া এই জনস্বার্থ মামলার ভিত্তিতে কেন্দ্র সরকার ও দিল্লি পুলিশের কাছে বিস্তারিত জবাব তলব করেছে শীর্ষ আদালত। আগামী দিনে এই মামলার পরবর্তী শুনানিতে কেন্দ্রীয় প্রশাসন কী অবস্থান নেয় এবং আদালত কী চূড়ান্ত রূপরেখা ঠিক করে, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে দেশের রাজনৈতিক মহল ও সংবাদমাধ্যমের।